Advt

Advt

rupantar-upanyas-story-galpo-part-10-by-nalinaksha-bhattacharya-tatkhanik-digital-bengali-web-bangla-online-e-magazine-রূপান্তর-নলিনাক্ষ-ভট্টাচার্য

ধারাবাহিক উপন্যাস প্রতি রবিবার

rupantar-upanyas-story-galpo-part-10-by-nalinaksha-bhattacharya-tatkhanik-digital-bengali-web-bangla-online-e-magazine-রূপান্তর-নলিনাক্ষ-ভট্টাচার্য

পর্ব ১০

দশ

চন্ডীতলা বয়েজ হাই স্কুলের ইংরেজির মাস্টার দিবাকর সেন সব শুনে বললেন, “ কাগজটা দেখি।”

অবিনাশবাবু প্রায় দুশো স্বাক্ষর সম্বলিত কাগজটা আগ্রহের সঙ্গে তুলে দিলেন দিবাকরের হাতে। দিবাকর কাগজটা না দেখেই কুটি কুটি করে ছিঁড়ে জানলা দিয়ে বাইরে ফেলে দিল। অবিনাশবাবু রাগে দুঃখে আর্তনাদ করে উঠলেন, “ দিবাকর! এ তুমি কী করলে? আমার একমাসের পরিশ্রম এভাবে নষ্ট করে দিলে তুমি?”

দিবাকর হেসে বলল, “ এই স্বাক্ষর সংগ্রহের ব্যাপারটা কোন উর্বর মস্তিষ্ক থেকে বেরিয়েছে একটু জানতে ইচ্ছে করে অবিনাশবাবু। দয়া করে বলবেন কি?”

অবিনাশবাবু দিবাকরের প্রশ্ন শুনে নিজেকে অনেক সংযত করে বললেন, “ কেন? তুমি কি বলতে চাও স্বাক্ষর সংগ্রহের কোন মূল্য নেই দিবাকর?”

নিশ্চয়ই আছে, অবিনাশবাবু। কিন্তু যে কাজে আপনি নেবেছেন তাতে স্বাক্ষর সংগ্রহ শুধু অপ্রয়োজনীয়ই নয়, হাস্যকরও।”

হাস্যকর?”

নিশ্চয়ই। যারা রোজ সন্ধ্যায় মদ না পেলে জুতোর কালি, কাফ সিরাপ থেকে স্পিরিট পর্যন্ত সাবাড় করে দেবে তাদের স্বাক্ষরের উপর নির্ভর করছে আপনার সাফল্য। যে সরষে দিয়ে ভূত তাড়াবেন তাতেই যদি ভূত থাকে তাহলে কতটা সাফল্য আপনি আশা করতে পারেন বলুন?”

অবিনাশবাবু ঘন ঘন মাথা নেড়ে বললেন, “ কিন্তু ওদের যদি আমরা সঠিকভাবে বোঝাতে পারি মদ খাওয়া অনিষ্টকর তবে ওরা কেন মদ খাওয়া ছেড়ে দেবেনা?”

দিবাকর টেবিল চাপড়ে বলল, “ এইখানেই আপনারা ভুল করেন, অবিনাশবাবু। কোন ছেলেকে অঙ্কের নিয়ম শিখিয়ে দিলেই যে সে নিয়মের সব অঙ্ক অক্লেশে ঠিকঠাক করে যাবে তার কোন নিশ্চয়তা নেই। বুঝবার জন্য শুধু বুদ্ধির দরকার হয় কিন্তু যেটা বুঝেছি সেটাকে কাজে পরিণত করতে ঐকান্তিক প্রচেষ্টা, অধ্যবসায়, আত্মিক বল, পরিশ্রম এবং আরও অনেকগুলো গুণের প্রয়োজন পড়ে।”

খুবই ঠিক কথা দিবাকর। কিন্তু এটাতো মানো কোন একটা জিনিষকে বোঝাটা কাজ করার প্রথম সর্ত। ওরা যদি মদের ক্ষতিকারক দিকটা বোঝে তবে অন্তত সইটাতো করবে। আর সই করলে . . .”

“ . . . হারুর দোকানটা উঠে যাবে, তাইনা?” অবিনাশবাবুর মুখের কথা ছিনিয়ে নিয়ে বলল দিবাকর।

নিশ্চয়ই। আর হারুর দোকানটা উঠে গেলে . . .”

“ . . . ভারতবর্ষে দিশি মদের প্রচলন উঠে যাবে, কি বলেন?”

অবিনাশবাবু একটু বিরক্ত হয়ে বললেন, “ তুমি ঠাট্টা কর আর যাই কর দিবাকর, আমার দৃঢ় বিশ্বাস হারুকে উঠিয়ে দিতে পারলে আমাদের যে নৈতিক জয় হবে তার ধাক্কা আশপাশের অনেক হারু ঘোষের গায়ে লাগবে।”

দিবাকর এবার গম্ভীর হয়ে বলল, “ দিশি মদ কীভাবে তৈরি হয় আপনার জানা আছে কি অবিনাশবাবু?”

অবিনাশবাবু একটু হেসে বললেন, “না, কোনদিন জানবার প্রয়োজন বোধ করিনি।”

জানলে ভালই করতেন, অবিনাশবাবু। আমিও যে খুব ভাল জানি তা নয় তবে এটুকু জানি যে দিশি মদ তৈরি খুব কঠিন কাজ নয়। পয়সাও খুব বেশি লাগেনা। হারু উঠে গেলে বস্তি অঞ্চলের ঘরে ঘরে মদ তৈরি যদি কুটির শিল্পে পরিণত হয় আমি খুব আশ্চর্য হবনা।”

দিবাকরের কথা শুনে অবিনাশবাবুর মনে হল তিনি এতদিন শুধু হাওয়ার সঙ্গে লড়াই করে আসছেন, শত্রু এখনো তার নাগালের বাইরে। যে মদকে তিনি হারুর দোকান উঠিয়ে দুর্লভ করে তুলবেন ভেবেছিলেন, সেটা যে এত সহজেই তৈরি করা সম্ভব এটা তার একবারেই মাথায় আসেনি। মাথায় হাত দিয়ে অবিনাশবাবু বললেন, “ তবে কি ওদের আটকাবার কোন রাস্তাই নেই দিবাকর?”

আছে অবিনাশবাবু। আপনিতো জানেন সব সমস্যার কোন না কোন সমাধান আছে। আমি যতটা বুঝি আমাদের সমস্যাটা স্বাক্ষর সংগ্রহ করে বা মাদক বর্জন সংক্রান্ত প্রচার পুস্তিকা বিতরণ করে সমাধান করা যাবেনা। এটা নিশ্চয়ই আপনি এখন বুঝতে পাচ্ছেন।”

অবিনাশবাবু দিবাকরের উজ্জ্বল চোখের দিকে তাকিয়ে মন্ত্রমুগ্ধের মত বললেন, “ হ্যাঁ দিবাকর, বেশ ভালভাবেই বুঝতে পাচ্ছি।”

দিবাকর অবিনাশবাবুর চোখে চোখ রেখে বলল, “ নেশা মানুষ কেন করে জানেন? অনেকে বলে ফূর্তির জন্য, মজা পাবার জন্য কিংবা শোক দুঃখ হতাশা ভুলে যাবার জন্য মানুষ নেশা করে। মিথ্যে কথা। আমার মনে হয় আদর্শহীন, উদ্দেশ্যহীন জীবনযাপন প্রণালীই মানুষকে আত্মিক অবক্ষয়ের দিকে নিয়ে যায়। আর আত্মিক অবক্ষয় থেকেই হয় মানুষের পতন। পতনের রাস্তা অজস্র। নেশা একটি অতি পুরনো এবং বহুপদলাঞ্ছিত পথ বিশেষ। কাজেই নেশা থেকে যদি মানুষকে দূরে সরিয়ে রাখতে চান তবে তাকে এক উন্নততর জীবনযাপন প্রণালীর মধ্যে টেনে আনতে হবে। সেটা খুব সহজ কাজ নয় অবিনাশবাবু।”

অবিনাশবাবু মনোযোগ দিয়ে দিবাকরের কথা শুনছিলেন। দিবাকর বেশ কিছু সমাজকল্যাণমূলক কাজের সঙ্গে দীর্ঘ দিন যাবৎ জড়িত একথা তিনি জানতেন এবং সেকারণেই দিবাকরের কাছে তিনি এসেছিলেন কিন্তু দিবাকর যে এত গভীরভাবে বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে ভাবতে পারে সেটা তার জানা ছিলনা। তাই দিবাকরের দিকে সপ্রশংস দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন অবিনাশবাবু, তারপর বললেন, “ তুমি কি কমুনিটি ডেভলপমেন্টের কথা বলছ দিবাকর? কিন্তু সেতো বিরাট ব্যাপার, আমার অতো ক্ষমতা কোথায়?”

দিবাকর অবিনাশবাবুর হাতটা নিজের মুঠোর মধ্যে শক্ত করে চেপে ধরে দৃঢ় প্রত্যয়ের সঙ্গে বলল, “ ভয় পাবেননা অবিনাশবাবু, আমি আছি আপনার সঙ্গে। আজ সন্ধ্যার দিকে আমার বাড়ি আসুন, ওখানেই সব কথা হবে।”

 ক্রমশ …………

১১তম পর্ব পড়ুন আগামী রবিবার

লেখক পরিচিতি      

জন্ম এবং শিক্ষা কলকাতায়;কর্মজীবন দিল্লিতে,কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রালয়ে। গল্প লেখার শুরু ষাটের দশকের শেষ দিকে। বাংলা এবং ইংরেজি দুই ভাষায় সাহিত্যচর্চা করে আসছেন গত পঞ্চাশ বছর ধরে। ইংরেজিতে চারটি উপন্যাস ও একটি গল্প সংকলন এবং বাঙলায় চারটি উপন্যাস ও দু’টি গল্পগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। বিবিসি থেকেও ওঁর কয়েকটি ইংরেজি গল্প প্রচারিত হয়েছে। দেশ,আনন্দবাজার,সাপ্তাহিক বর্তমান, নবকল্লোল, পরিচয়, কালি ও কলম(বাংলাদেশ) এবং দিল্লি ও কলকাতার অনেক সাহিত্য পত্রিকায় গল্প লেখেন নলিনাক্ষ বাবু দিল্লি থেকে প্রকাশিত ‘ কলমের সাত রঙ’ পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত আছেন।