Advt

Advt

rupantar-upanyas-story-galpo-part-10-and-11-by-nalinaksha-bhattacharya-tatkhanik-digital-bengali-web-bangla-online-e-magazine-রূপান্তর-নলিনাক্ষ-ভট্টাচার্য

ধারাবাহিক উপন্যাস প্রতি রবিবার

rupantar-upanyas-story-galpo-part-10-and-11-by-nalinaksha-bhattacharya-tatkhanik-digital-bengali-web-bangla-online-e-magazine-রূপান্তর-নলিনাক্ষ-ভট্টাচার্য
পর্ব ১১ এবং ১২

এগারো

বাইরের ঘরে একটা বোর্ডের গায়ে পাশাপাশি দু’খানা বড় নক্সা পিন দিয়ে আটকে দিয়ে দিবাকর একপাশে সরে দাঁড়াল। হাতের সরু লম্বা লাঠিটা প্রথম নক্সার উপর রেখে বলল, “এটা হল বেলতলা বস্তিতে আমরা কাজ শুরু করার আগের অবস্থা।” লাঠির ডগাটা সরিয়ে দ্বিতীয় নক্সার উপর নিয়ে এসে দিবাকর বলল, “আর এই হল বেলতলা বস্তি উন্নয়নের কাজ শুরু করার ছ’মাস পরের অবস্থা। পার্থক্যটা নিশ্চয়ই লক্ষ করতে পারছেন।”

অবিনাশবাবু চেয়ার ছেড়ে বোর্ডের সামনে এসে দাঁড়ালেন। তারপর চশমাটা নাকে গলিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে নক্সা দুটোর পার্থক্য লক্ষ করতে লাগলেন। একটু পরে চেয়ারে এসে বসে বললেন, “ যাই বল পরিবর্তনটা কিন্তু বেশ চোখে লাগার মত। এতদিনে নিশ্চয়ই আরও অনেক পরিবর্তন এসেছে বেলতলা বস্তিতে।”

দিবাকর আবার লম্বা লাঠিটাকে দ্বিতীয় নক্সার উপর নিয়ে এল। “ দেখুন অবিনাশবাবু, এইযে রাস্তাটা দেখছেন এটা মাটির রাস্তা ছিল, বর্ষায় জল জমে কাদা হয়ে বিচ্ছিরি অবস্থা হত। এটা সুড়কি দিয়ে বাঁধান হয়েছে। এখানে প্রাইমারি স্কুলটাকে অনেক লেখালেখি তদ্বির তদারকি করে মিডল স্কুল করা হয়েছে। এই যে সবুজ দাগটা দেখছেন এখানে কিছু জঙ্গল, ঝোপঝাড় ছিল। লোকেরা ঘরের আবর্জনা ফেলত এখানে। জায়গাটা সাফ করে বাচ্চাদের জন্য একটা ছোট পার্ক তৈরি করা হয়েছে। এই পাটকিলে রঙের দাগটা হচ্ছে গিয়ে কমুনিটি সেন্টার। যেসব মেয়েরা বাইরে কাজ করতে যায় তাদের জন্য ক্রেশে, একটা লাইব্রেরি, সেলাই শেখার স্কুল ইত্যাদি এখানে করা হয়েছে। এছাড়া রাত্রে এখানে নিরক্ষরতা দূরীকরণ সমিতির পক্ষ থেকে নাইট স্কুল খোলা হয়েছে।”

দিবাকর এসে চেয়ার নিয়ে অবিনাশবাবুর মুখোমুখি বসল, তারপর একটু ঝুঁকে হেসে বলল, “ খুব ঘাবড়ে গেছেন মনে হচ্ছে অবিনাশবাবু, কী ব্যাপার?”

অবিনাশবাবু হেসে বললেন, “ ঘাবড়াবার মত ব্যাপারই বটে। আচ্ছা, এত টাকা তোমরা কোত্থেকে পেলে বল দেখি? স্কুল, কমুনিটি সেন্টার সবই দেখছি পাকা বাড়ি। এতো অনেক টাকার কাজ।”

দিবাকর হেসে বলল, “ এতক্ষণে আপনার ঘাবড়াবার কারণটা বোঝা গেল। হ্যাঁ, তা টাকা তোলা প্রথম দিকে একটু শক্ত বইকি, তবে কাজ শুরু করে দিলে টাকা ঠিক এসে যায়, এটাই আমাদের অভিজ্ঞতা। প্রথমদিকে বস্তির লোকদের কাছ থেকে দশ টাকা বিশ টাকা করে চাঁদা তুলে আর তার সঙ্গে আমরা নিজেদের পকেট থেকেও কিছু দিয়ে কাজ শুরু করে দিয়েছিলাম। কাজ কিছুটা এগোবার পরে ধীরে ধীরে অর্থশালী কিছু লোক দান করতে এগিয়ে আসেন। স্কুল, কমুনিটি সেন্টার ইত্যাদি তৈরির ব্যাপারে সরকারও কিছু কম সাহায্য করেনি। অবশ্য এজন্য ছোটাছুটি কম করতে হয়নি। আমার ব্যক্তিগত বিশ্বাস কি জানেন অবিনাশবাবু? এসব কাজে টাকার অভাব কখনো হয়না, বরঞ্চ অভাব হয় উদ্যোগী কর্মির। এধরণের কাজ বাইরে থেকে দু’চারজন সমাজসেবী নিয়ে এসে করা যায়না।আমরা ওদের সঠিক রাস্তা দেখিয়ে দিতে পারি, প্রথমদিকে কিছু সাহায্য করতে পারি, কিন্তু তার বেশি নয়। ওদের কাজ ওদের দিয়ে করাতে হবে, তা নাহলে কাজ এগোবেনা আর এজন্যই পুরনো অর্থহীন, উদ্দেশ্যহীন, অবক্ষয়ী জীবনযাপন প্রণালীর মধ্য থেকে ওদের টেনে বের করে ঢুকিয়ে দিতে হয় নূতন কর্ম যজ্ঞের মধ্যে। এই প্রথম ধাক্কা দেওয়াটাই খুব কঠিন কাজ। একবার চাকা ঘুরিয়ে দিতে পারলে গাড়ি ওরা নিজেরাই চালিয়ে নিতে পারবে।”

অবিনাশবাবু গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনছিলেন দিবাকরের কথা। অনেকদিন আগে নিজের গ্রামের যুবকদের সাহায্য নিয়ে নেতাজী বিদ্যালয় স্থাপন করেছিলেন অবিনাশবাবু। দিবাকরের কথা শুনতে শুনতে তার মনে হচ্ছিল দিবাকর যেন তাঁর নেতাজী বিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র, দীর্ঘদিনের বিচ্ছিন্নতার পর আজ তাঁরা দু’জন মিলিত হয়ে নূতন করে দেশের কাজে ঝাঁপিয়ে পড়তে যাচ্ছেন। অবিনাশবাবু দিবাকরের কাঁধে হাত রেখে বললেন, “ তুমি আমাকে বাঁচালে দিবাকর। এই বয়সে আবার নূতন করে একটা বড় কাজে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারব এত বড় আশা করিনি। এস এবার আমরা একটা প্রাথমিক কাজের খসড়া তৈরি করে নিই।”

চটপট দেরাজ থেকে কাগজ কলম বের করে দিবাকর বলল, “ হ্যাঁ আসুন শুরু করা যাক।”

 

বারো

বেঁটে বোসের বউ সুলতা বললেন, “ বস্তির ওপাশের মাঠে কী হচ্ছেগো? অনেকগুলো ইস্কুলের ছেলে দেখলম কোদাল নিয়ে নেমে পড়েছে।”

ঠোঁট উল্টে সুবীর বোস বলল, “ বুড়ো বয়সে অবিনাশবাবুর ভিমরতি ধরেছে। বস্তির ছেলেরা নাকি ওখানে ফুটবল খেলবে।”

সুলতা স্বামীর হাতে পান ধরিয়ে দিয়ে বললেন, “ দিবাকর মাস্টারও দেখলাম ওদের সঙ্গে কাজ করছে।”

বোসবাবু পান চিবোতে চিবোতে বললেন, “ একে মা মনসা, তায় আবার ধুনোর গন্ধ। দেখ জল কতদূর গড়ায়। বস্তির ছোটলোকদের নাকি ওরা ধরে ধরে ভদ্দরলোক বানিয়ে দেবে।”

সুলতা হঠাৎ গলা খাঁটো করে বললেন, “ হ্যাঁগো অবিনাশবাবুর হারু ঘোষের কাছ থেকে পঞ্চাশ হাজার টাকা পাবার ব্যাপারে আর কিছু শুনলে?”

বোসবাবু হাই তুলে বললেন, “ নিশ্চয়ই এদ্দিনে পেয়ে গেছেন। হারু ঘোষের বিরুদ্ধে আর তো  দেখছি কোন কথা বলছেননা। স্বাক্ষর সংগ্রহও বন্ধ, তার মানে টাঁকাটা হাতে এসেছে। দেখতে অমন সাদাসিধে হলে হবেকি ভদ্দরলোক বেশ গভীর জলের মাছ। এবার দেখ বস্তি উন্নয়নের নাম করে দু’হাতে কীরকম কামিয়ে নেয়।”

সুলতা হেসে বললেন, “ তা তুমিওতো নেমে পড়তে পার ওদের সঙ্গে।”

বোসবাবু বললেন, “ মাথা খারাপ, ওই ছোটলোকদের সঙ্গে কোদাল গাঁইতি নিয়ে নামব আমি! কক্ষনো নয়, লাখ টাকা দিলেও নয়।” 

মিলির হাতে একটা চাঁদার বই ধরিয়ে দিয়ে কণা বলল, “ তিন দিনের মধ্যে ফেরত দিয়ে দিতে হবে কিন্তু ভাই।”

মিলি চাঁদার বইটা ভালভাবে নেড়েচেড়ে বলল, “ ওমা, এতো দেখছি অনেক টাকার ব্যাপার। আমি কোত্থেকে এত টাকা তুলব?”

কণা মিলির মাথায় চাটি মেরে বলল, “ থাক আর ন্যাকামি করতে হবেনা। তোর মত গুচ্ছেক বড় লোক বন্ধু থাকলে আমি একাই হাজার দশেক টাকা তুলে ফেলতে পারতাম। এ তো মাত্র এক হাজার টাকার ব্যাপার।”

মিলি ঠোঁট উল্টে, নাক কুঁচকে বলল, “ তাও যদি কালচারাল ফাংশন টাংশন হতো। বস্তি উন্নয়নের নাম শুনলেই যে সব নাক সিঁটকোতে শুরু করবে। নাঃ তোর বাবা আর আমাদের শান্তিতে থাকতে দেবেনা দেখছি।”

কণা এবার মিলির কানের কাছে মুখ নিয়ে এসে বলল, “ আর কাউকে না পারিস তোর রাজপুত্তুরের হাতে গছিয়ে দিস চাঁদার বইটা, দেখবি ফটাফট তুলে দেবে এক হাজার টাকা।”

মিলি বলল, “ শেষ পর্যন্ত তাই করতে হবে সেতো বুঝতেই পাচ্ছি। কিন্তু তোর ইঞ্জিনিয়ার, সে কি কচ্ছে?”

কণা হেসে বলল, “ ওর হাতেও দু’খানা বই ধরিয়ে দিয়েছি।”

মিলি চাঁদার বইটা হাতব্যাগের মধ্যে পুরে বলল, “ যাই বল বাপু ছোটলোকদের বেশি আস্কারা দেওয়া ঠিক নয়। সব যদি ভদ্দরলোক হয়ে যায় তবে ঝি চাকরের কাজ করবে কে শুনি?”

কণা বলল, “ কেন, ভালইতো হবে। সব ভদ্দরলোক হয়ে গেলে সবাই নিজের নিজের কাজ করবে। বিদেশেতো শুনেছি ঝি চাকর একেবারেই উঠে গেছে। এখানেও তেমনি হয়ে যাবে।”

মিলি বলল, “ বুঝতে পাচ্ছি, তুই লেকচার দেবার জন্য হাঁসফাঁস করছিস। কেন্টিনে আজ মাংসের ঘুগনি হয়েছে। চল ঘুগনি দিয়ে আজ তোর মুখ বন্ধ করাচ্ছি।”

 ক্রমশ …………

১৩তম পর্ব পড়ুন আগামী রবিবার

লেখক পরিচিতি      

জন্ম এবং শিক্ষা কলকাতায়;কর্মজীবন দিল্লিতে,কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রালয়ে। গল্প লেখার শুরু ষাটের দশকের শেষ দিকে। বাংলা এবং ইংরেজি দুই ভাষায় সাহিত্যচর্চা করে আসছেন গত পঞ্চাশ বছর ধরে। ইংরেজিতে চারটি উপন্যাস ও একটি গল্প সংকলন এবং বাঙলায় চারটি উপন্যাস ও দু’টি গল্পগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। বিবিসি থেকেও ওঁর কয়েকটি ইংরেজি গল্প প্রচারিত হয়েছে। দেশ,আনন্দবাজার,সাপ্তাহিক বর্তমান, নবকল্লোল, পরিচয়, কালি ও কলম(বাংলাদেশ) এবং দিল্লি ও কলকাতার অনেক সাহিত্য পত্রিকায় গল্প লেখেন নলিনাক্ষ বাবু দিল্লি থেকে প্রকাশিত ‘ কলমের সাত রঙ’ পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত আছেন।