এক সকালে অরিত্র ঘুম থেকে উঠে বাড়ি থেকে
পালালো। অবশ্য হুট করে নয়। কয়েক মাস যাবৎ মনের কুটিরে বিচরণ ছিল। পাশাপাশি চুলচেরা
বিশ্লেষণ। পক্ষে বিপক্ষের সূক্ষ মতবাদ। গত রাতেই নিজের সঙ্গে বোঝাপড়া করে চূড়ান্ত
করেছে। সিদ্ধান্ত নেওয়াটা কঠিন ছিল। ফলে সারারাত একবিন্দু ঘুমোতে পারে নি। নিজের
যুক্তি নিজেই খণ্ডন করে তার ফলপ্রসূ উত্তর বের করা বেশ শক্ত কাজ। পরিশ্রম সাধ্যও।
এককথায় সাহসী পদক্ষেপ। দুঃসাহসও বলা যায়। একবার মহাপ্রস্থানের পথে যাত্রা করে ফিরে
আসাটা চরম অপমান ছাড়া কিছু নয়। মৃত্যুর সামিল। তাই মনের সঙ্গে এত কঠোর মনন।
না, বাড়ি থেকে কেউ পলায়ন করতে বলে নি।
অপমানও করেনি। ভালবাসারও ঘাটতি নেই। তবে কেন যাচ্ছে সে প্রশ্ন সম্পূর্ণ
ব্যাক্তিগত। জানে তার অনুপস্থিতিতে বিশাল আলোড়ন সৃষ্টি হবে। মা হয়তো চোখের জলে
ভাসাবে। দাদাদের ব্যতিব্যস্ত করে তুলবে। থানাপুলিশ হবে নিশ্চিত। এমনকি দৈনিক
পেপারে সন্ধান চাই বলে ছবি সহ বিজ্ঞাপনও দেবে। এসব হাঙ্গামা যাতে না করতে হয় তার
ব্যবস্থা সে করেই যাচ্ছে। লোক জানাজানি, লোক হাসাহাসি, অহেতুক ব্যঙ্গ বিদ্রুপ থেকে
বিরত থাকাটা আবশ্যক। একটি চিঠি লিখে স্থান ত্যাগ করল। তার সুপ্ত ইচ্ছেগুলো প্রকাশ
করে যাওয়াই যুক্তিযুক্ত।
স্থির ছিল বন্ধু অনিমেষ সঙ্গী হবে। এক
বিকেলে নিরালায় বসে দুই বন্ধু মিলে নির্বাসনের
রূপরেখা তৈরি করে। চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে থমকে যায়। দু'জনের সমস্যা এক হলেও
হুবহু নয়। যেমন দুটি মানুষ কখনও একরকম হয় না তেমনি ব্যক্তিগত যাপনেও কিঞ্চিৎ
পার্থক্য থাকবেই। তাকে জয় না করা পর্যন্ত স্থগিত রাখতে হয়। দ্রুত সমাধান করতে হবে
তাকেই। দুটি মন সমান্তরাল না হলে বিফল হতে বাধ্য। তাই মন স্থির করা জরুরি। শেষ মুহূর্তে অনিমেষ দ্বিধাদ্বন্ধে থমকে যায়।
অবশ্য তাকে দোষ দেওয়া যায় না। বাড়িতে মা আর অনিমেষ। তৃতীয় ব্যক্তি নেই। এক দিদি
আছেন ব্যাঙ্গালোরে স্বামীর সঙ্গে সুখে সংসার করছে। দিদি জামাইবাবু মাকে নিয়ে
যাওয়ার প্রানপন চেষ্টা করেছিল। মা একরোখা। মেয়ের অধীনে থাকাটা কিছুটা সম্মান হানি
মনে করেন। পরাধীন। অকাট্য যুক্তি। কিন্তু অনিমেষ মাকে একা রেখে নির্বাসনে যায় কি
করে? উপযুক্ত সন্তান থাকতে মা ভরা নদীতে হাবুডুবু খাবেন মেনে নেওয়া কষ্টকর। অতটা
পাষান হৃদয় নয়। তাই বন্ধুর প্রস্তাবে শেষলগ্নে ইতি টেনে দিল।
অরিত্র সিদ্ধান্ত বদল করল না। বরং জেদ দৃঢ়
হল। কথায় বলে, একা বোকা। সে মানে না। একার
শক্তি বহুগুণ বেশি। ভুলভ্রান্তির কৈফিয়ত দেওয়ার দায় নেই। কোনও সংশয়ও নেই। নিজেই নিজের অভিভাবক। সে
কাকভোরে বাড়ির সদস্যরা ঘুম থেকে ওঠার আগে সকলের অগোচরে একটা ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে
পড়ল। গত রাতেই ব্যাগ গুছিয়ে রেখে ছিল। নিত্য প্রয়োজনীয় যা না হলেই নয় এবং সঞ্চিত
অর্থটুকু সম্বল করে প্রস্থান করল। অন্তত কয়েক মাস গ্রাসাচ্ছাদনের নিশ্চিত
ব্যবস্থাটা রাখতেই হবে। ব্যান্ডেল স্টেশনের কাছে তার বাড়ি। পায়ে হেঁটেই পৌঁছে গেল।
রাস্তাঘাট সুনসান হলেও স্টেশনে পৌঁছে দেখে বহু মানুষজনের সমাগম। সে কখনও এত সকালে স্টেশনে আসেনি। নতুন
অভিজ্ঞতা। স্টেশনে এসে দেখে যাত্রীদের ব্যস্ততা। টিকিট কাউন্টারে দাঁড়িয়ে ভাবছে
কোথায় যাবে? আগে গন্তব্যস্থল স্থির করা দরকার। তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি।
কয়েক মাসের প্রস্তুতি অথচ কোথায় যাবে সেটাই স্থির করেনি! অবিবেচকের মতো কাজ করে
ফেলেছে। আপাতত হাওড়া যাবার টিকিট কাটল। এরপর ভাবার অবকাশ পাবে।
ব্যান্ডেল হাওড়া লোকাল। ভাগ্যক্রমে জানলার
ধারে সিট পেয়ে গেল। আজ জুনের এগারো তারিখ। ভ্যাপসা গরম সকাল থেকেই। অথচ তিনদিন
আগেই আকাশ ভেঙে এলাকা ভাসিয়েছিল। দিনরাত তুমুল বৃষ্টি। পরদিন থেকে অবশ্য
সূর্যদেবের হাসির ঝিলিক। তেমনি ভ্যাপসা গরম।
ভাবছে বাড়ির কথা। এতক্ষণে হয়তো বাড়িতে নজর
পড়ে গেছে। সকাল সাড়ে ছ'টায় চা বিস্কিট খেয়ে টিউশনিতে বেরিয়ে যায় । প্রথম চা-টা মা
করে দেন। ফিরে এসে সাড়ে আটটায় টিফিন, চা। সেটার দায়িত্ব বড়বৌদির। এক্ষুনি সোরগোল
পড়ার সম্ভাবনা নেই। অন্তত একদিন দুঃশ্চিন্তা করবে না কেউ।
অরিত্ররা তিন ভাই এক বোন। সে সবার ছোট এবং সকলের আদরের। বড়দা স্টেটব্যাংকের
প্রবেশনারী অফিসার। ব্যস্ত মানুষ। মেজদা ডবলু বি সি এস। দিনরাত অফিসের চিন্তা
মাথায়। তারপর দিদি। গতবছর বিয়ে হয়েছে।
জামাইবাবুর সঙ্গে কানাডায় সেটেল্ড। অরিত্র ম্যাথে এমএসসি। ফার্স্ট ক্লাস। স্কুল
লেভেল থেকে আগাগোড়া রেজাল্ট ভাল। কিন্তু দুর্ভাগ্য পাঁচ বছর অতিক্রান্ত তবু চাকরি
জোটাতে পারে নি। চাকরির পরীক্ষা, ইন্টারভিউ দিতে দিতে বীতশ্রদ্ধ। বয়সও পেরিয়ে যেতে
চলেছে। ফলে এক রকম হতাশা গ্রাস করতে শুরু করে। ইনকাম সেও কিছু করে। টিউশনি করে
চৌদ্দ-পনের হাজার টাকা রোজগার হয়ই। ইচ্ছে করলে আরও বাড়াতে পারে। ডাবল ইনকাম করা
সম্ভব। কিন্তু সেটা তো ভবিষ্যৎ নয়। দাদাদের সমকক্ষ না হলে এক পরিবারে থাকা
বেমানান। এতদিন সূক্ষ খুঁটিনাটি ব্যাপারগুলো নিয়ে ভাবেই নি। চাকরির চেষ্টা ও
টিউশনি ছাড়া অন্যদিকে ধ্যান দেওয়ার অবকাশও
ছিল না। একদিন চূর্ণী কথা প্রসঙ্গে চোখে আঙুল দিয়ে মগজে ঢুকিয়ে দিয়েছে।
বাস্তব সত্যি। তখন থেকেই টনক নড়ে। জোর ধাক্কা। একেবারে মনের অতল গহবরে গিয়ে আলোড়ন।
বর্তমান যুগে যোগ্যতা পরিমাপ হয় ইনকাম দেখে। শ্রদ্ধা ভালবাসা সবই তুলাদণ্ডে মাপা
হয় ওই রোজগারের উপর।
চূর্ণী একদিন বলল," তোমার ঐ টিউশনির
খুচরো আয় নিয়ে আমি বউ হয়ে যেতে পারব না। তোমার দাদা-বৌদিদের সম্মুখে নত হয়ে থাকা
আমার পক্ষে অসম্ভব। এর থেকে বিয়ে না হয় না হবে।"
অরিত্র ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গিয়েছিল। পাঁচ
বছরের গভীর প্রেম। এলাকার সবাই জানে আদর্শ জুটি। মা দাদা-বৌদির খুব পছন্দ চূর্ণী
কে। এরপরেও চূর্ণী কথাটা বলতে পারল! এদিকে বাড়িতেও একধাপ এগিয়ে গেছে।
এক রাতে খেতে বসে মা বড়দাকে বললেন, "
ছোটখোকার বিয়েটা শিগগিরই দিয়ে দিতে চাই।
তোরা কি বলিস।"
বড়দা বললেন," দিয়ে দাও। চাকরির আশায়
বসে থেকে লাভ নেই। একভাবে না একভাবে ঠিক চলে যাবে। তাছাড়া আমরা তো আছি। পুরোহিতকে
খবর দাও। আগামী মাসেই দিন ঠিক করে ফেলুক।"
মেজদা বললেন," আজকাল ভাল ছেলেদের চাকরি
নেই বড়দা। ভাইয়ের মতো ব্রিলিয়ান্ট ছেলেরা যদি চাকরি না পায় কি বলবে তুমি। যারা
লক্ষ লক্ষ টাকা ঘুষ দিতে পারবে তারাই শুধু চাকরি করবে। চাকরির আশা ছেড়ে দে ভাই।
অন্য কিছু একটা করতে হবে। ঘুষ দিয়ে চাকরি করার পক্ষপাতি আমি নই।"
বড়দা বললেন," ওসব পরে ভাবা যাবে। শুভ
কাজটা আগে হয়ে যাক। বিয়েরও একটা বয়স থাকে। এটা অন্তত আগে হোক। পরে ভেবেচিন্তে একটা
কিছু করা যাবে।"
অরিত্র এতসব তলিয়ে ভাবেনি কোনোদিন। মা বাবা দাদা বৌদি কখনও চাকরি না পাওয়ার জন্য
কটু বাক্যও শোনাননি। বরং সহানুভূতির মনোভাব সর্বক্ষণ। চূর্ণীর কথায় নতুন করে ভাবতে
শিখছে। তাদের সংসারটা এখনও মা চালনা করেন। যখন যা টাকা দরকার বড়দা মেজদার কাছ থেকে
চেয়ে নেন। কখনো টাকা দিতে বেজার হতে দেখে নি। বলতেন, দরকার লাগলে আরও নাও। মা
নিতেন না। আরেকটা ব্যাপার লক্ষণীয়, বাবা একটি মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানির চিপ
এক্সিকিউটিভ ছিলেন। কোনও পেনশন নেই। অবসরকালীন থোক টাকা যা পেয়েছেন ব্যাংকে গচ্ছিত
আছে। মাসে মাসে ইন্টারেস্ট ড্র করেন। সেই থেকে কিছু টাকা সংসারের জন্য মাকে দেন।
সেটাও কম নয়। চূর্ণী বলল, তোমার এবং বাবা-মায়ের খোরাকির টাকাটা দেন। এটাও বুঝতে
পারো না? যাতে কেউ কখনও বলতে না পারেন,
ওরা ছেলেদের উপর নির্ভরশীল। তোমার দায়িত্বটাও বাবা-মা বহন করছেন।
এতসব জটিল কথা ভাবতে গিয়ে অরিত্র চোখেমুখে
অন্ধকার দেখছে। চূর্ণী অত্যন্ত যুগোপযোগী কথা বলেছে। দুদিন বাদে অরিত্রর ইনকাম
প্রসঙ্গ উঠতে বাধ্য। সীমিত রোজগারে কি করবে সে? ব্যবসার কোনও অভিজ্ঞতা নেই। তাছাড়া
অল্প টাকায় কি ব্যবসা করবে? তাতেও তো দাদাদের দয়ায় বেঁচে থাকতে হবে।
এক রবিবারে অরিত্রর বাবা-মা চূর্ণীদের বাড়ি
গেলেন বিয়ের দিন পাকা করতে। এমনটা ঘটবে কল্পনাতীত ছিল। চূর্ণীর বাবা স্পষ্ট জানিয়ে
দিলেন, বেকার ছেলের সঙ্গে তাদের মেয়ের বিয়ে দেবেন না। চূর্ণিরও নাকি একই ইচ্ছে।
বাবা-মা বাক্যহারা।
এরপর কিছু বলার থাকতে পারে না।
মা বললেন, ভালবাসা না কাঁচকলা। এমন মেয়ের
সঙ্গে মিশেছিস তোকে পাত্তাই দিচ্ছে না।
অরিত্র বোবা। এমন ভাবে পৃথিবীতে বেঁচে থাকার কি মানে ? চূর্ণী আগেই ইঙ্গিত
দিয়েছিল। অরিত্র এখন বুঝছে, ভালবাসা নয় ইনকামই সব।
ট্রেন হাওড়া ঢুকে গেছে। অরিত্র ছুটছে
রিজার্ভেশন কাউন্টারের দিকে। দূর পাল্লার কোনও ট্রেনে উঠে পড়বে। তারপর কপালে যা
আছে। ট্রেনের টাইমগুলো দেখছে। কোথায় যাওয়া যায়?
সাড়ে আটটায় পূর্বা এক্সপ্রেস। ভাগ্যক্রমে তৎকালে এসি স্লিপার ক্লাসে
রিজাভেশন পেয়ে গেল। নিউ দিল্লি।
জানলার ধারে সিট। মন্দের ভালো। মিনিট
পাঁচেকের মধ্যে ট্রেন ছেড়েও দিল। অরিত্র
কেমন এক ঘোরের মধ্যে আছে। তাহলে সত্যি সত্যি সকল মায়া ত্যাগ করে অজানা পথে পাড়ি
দিল ! এবার একটু ঘুমোনোর চেষ্টা করতে হবে। গতরাতে নিদ্রাদেবী দেখা দেয়নি। সম্মুখের
সিটের ভদ্রলোক পেপার পড়ছেন। প্রবীণ। চেহারায় আভিজাত্যের চাপ স্পষ্ট। বয়স বোধকরি
সত্তরের কম নয়। প্রাথমিক কথাবার্তায় জানা গেল তিনিও দিল্লি যাচ্ছেন। পেপার রেখে আবার অরিত্রর দিকে দৃষ্টি। তাকেই
দেখছেন।
বললেন," দিল্লি কোথায় যাবেন?"
অরিত্র অপ্রস্তুতে পড়ে গেল। সত্যিই তো।
কোথায় যাবে?
বলল," এখনও ঠিক করিনি। পৌঁছে
সিদ্ধান্ত নেব।"
" কোনও কাজে? ব্যবসা সংক্রান্ত? না চাকরি?"
এই রে! লোকটাতো ভোগাবে মনে হচ্ছে। রীতিমতো
জেরা শুরু করে যাচ্ছে।
অরিত্র বলল," ব্যক্তিগত কাজ আছে কিছু। "
মনে হচ্ছে বিশ্বাস করেন নি। তার দিকেই
তাকিয়ে আছেন। সন্দেহ করছে ! অন্য কিছু ভাবছে ! ভাবুক। তার কি এসে যায়।
আবার প্রশ্ন ! ভাল লাগে ! বিরক্তির একশেষ।
চোখ বুঝে ঘুমোনোর চেষ্টা করল।
"পড়াশুনা কোথায়? কলকাতা? না
দিল্লি?"
উত্তর দিল। আবার প্রশ্ন। আবার উত্তর দিল।
আবার একটার পর একটা করেই যাচ্ছে। শেষমেষ অরিত্র সত্যি কথাটাই বলে ফেলল। হড়বড় করে সমস্ত কথা। নির্বাসনে যাচ্ছে।
শুনে ভদ্রলোক বোবা। মুখে কথা নেই। তবু একদিক থেকে স্বস্তি।যেভাবে আসামির জেরা শুরু
করে দিয়েছিলেন। কাহাতক সহ্য হয়। যাই করুক চুরি তো করছে না।
হঠাৎ ভদ্রলোক বললেন, "ওঠো। একটু
এগিয়ে গিয়ে দরজাটা খোলো। তারপর ট্রেন থেকে ঝাঁপ দাও। সমস্ত সমস্যার সমাধান হয়ে
যাবে।"
অরিত্র হতভম্ব ! এমন কথা কেউ বলতে পারে !
বললেন," তুমি একটা কাপুরুষ ! তোমার মত ছেলের বেঁচে থাকার অধিকার নেই। যার জেদ
নেই মনোবল নেই তাকে মানুষ বলেই গণ্য করি না। বাড়ি থেকে পালিয়ে কি করবে? সেই তো
বিশ-পঁচিশ হাজার টাকার চাকরি। তাতে কি হবে? বলিহারি ভাবনা। চাকরি পাওনি বলে জীবন শেষ হয়ে গেল ! নিজের
প্রতি আস্থা নেই? আমাকে দেখো, দশ হাজার টাকা দিয়ে শুরু করেছিলাম। আজ আমার
কোম্পানিতে দেড় হাজার কর্মচারী। দশ হাজার কোটি টাকার ইয়ারলি টার্নওভার। সেটা কি
এমনি এমনি হয়েছে? প্রবল জেদ এবং একশো শতাংশ উদ্যোগ নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। হ্যাঁ
ধৈর্য রাখতে হবে। বিফল হলে আবার ঝাপাতে হবে। পিছিয়ে হেরে গেলে চলবে না। যাও, আমি
বলছি বাড়ি ফিরে যাও।"
ভদ্রলোকের কথা শুনে অরিত্রর মনে এক আলোড়নের
ঢেউ উঠেছে ঠিকই কিন্তু সব কথা বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছে না। যদি উনি বিজনেস ম্যাগনেট
হন তাহলে কলকাতা থেকে দিল্লি ট্রেনে যাচ্ছেন কেন? তাদের তো সময়ের মূল্য অনেক।
স্টাটাস বলেও একটা কথা আছে। উনি প্লেনে যাননি কেন? অর্থাৎ যা বললেন, ফাঁকা আওয়াজ।
আবার বললেন," কি হল? আমার কথা কানে গেল? বোধগম্য হল? যাও, পরের স্টেশনে নেমে
যাও। আমি তোমার বাবার থেকেও বয়সে বড় হব হয়তো। আমার কথাটা শোনো। বাবা-মাকে চিন্তায়
ফেলে কষ্ট দিয়ে জীবনে সফল হওয়া যায় না।"
অরিত্র বলল," ফিরে যাওয়ার উপায় নেই। যা চিঠি লিখে রেখে এসেছি, এরপর কাউকে মুখ
দেখাতে পারব না" ।
" তোমার আত্মসম্মান বোধ দেখে ভাল
লাগছে।কিন্তু ভাবনাগুলো পজেটিভ নয়।"
অরিত্র বলল," আপনিতো দেখছি ব্যস্ত মানুষ। প্লেনে না গিয়ে ট্রেনে এলেন
কেন?"
" ঠিক কথাই বলেছ। আসলে আমার কানের একটু সমস্যা আছে। ট্রিটমেন্ট চলছে। ডাক্তার
বলেছেন, কয়েকমাস প্লেনে যাতায়াত অ্যাভয়েড করতে। আমার এক আত্মীয় সিরিয়াস অসুস্থ।
তাই বাধ্য হয়ে ট্রেনে আসা। না হলে আমি দিল্লির হেড কোয়ার্টার্স থেকে বাইরে যাই না।
ম্যানেজারদেরই পাঠাই। যাইহোক, তুমি এই কার্ডটা রাখো। হেল্প নিতে চাইলে নিঃসংকোচে
দেখা করো।"
অরিত্রের ভেতর গঙ্গার জোয়ার ভাটা চলছে। বাড়ি
থেকে চলে আসার সিদ্ধান্তটা ভুল হলেও ফিরে যাওয়ার উপায় নেই। ভদ্রলোকের কথার মধ্যে
যুক্তি আছে কিন্তু ফিরে আর যাবে না সে। যা থাকে কপালে। দুপুরে রাতে রেলের খাবারই
খেয়েছে। অবশ্য ভদ্রলোকই পে করলেন সব।
রাতে সামান্য ঘুমও হল। অর্ধনিদ্রিত।
নির্বাসনে যাচ্ছে। সব ক্ষেত্রে মানিয়ে নেওয়ার অভ্যাস রপ্ত করতে হবে। কঠিন লড়াই।
বাঁচা-মরার সমস্যা সবই এখন তুচ্ছ। জীবন বাজি রেখে এগুচ্ছে। অত ভাবলে চলে ?
পরদিন বেলা নটা নাগাদ দিল্লি পৌঁছল। অরিত্র
বলল," চলি কাকাবাবু। প্রয়োজনে ফোন করব।"
ভদ্রলোক বললেন," যাবে কোথায়? চলো আমার
সঙ্গে।"
" আপনার সঙ্গে? কোথায় যাব?"
ধমকের সুরে বললেন," জাহান্নামে যাবে।
কথা না বলে চল আমার সঙ্গে।"
অরিত্র আর কোনও কথা বলার সাহস পেল না। স্টেশনের বাইরে এসে দেখে গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে।
দামি গাড়ি। আগে তাকেই উঠতে বললেন। অগত্যা। গাড়িতে চেপে বসল। জাহান্নামে চলল।
লেখকের অন্যান্য লেখা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।
লেখক পরিচিতি -
নিত্যরঞ্জন দেবনাথ পূর্ব বর্ধমান জেলার কাটোয়ার পানুহাটে ১৯৫৬ সালে জন্মগ্রহণ করেন।কাটোয়া কলেজ থেকে বাণিজ্যে স্নাতক। বর্তমানে থাকেন হুগলির চুঁচুড়ায়। পেশায় কেন্দ্রীয় সরকারের কর্মী ছিলেন।অ্যাকাউন্টেন্ট জেনারেল-এর অধীন ডিভিশনাল অ্যাকাউন্টস অফিসার পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেন। তাঁর প্রথম গল্প " চেতনা " ছোটদের পত্রিকা শুকতারায় ১৯৯৬ - এর এপ্রিলে প্রকাশিত হয়। এরপর দেশ, শিলাদিত্য, কালি ও কলম,মাতৃশক্তি, তথ্যকেন্দ্র, কলেজস্ট্রিট, কথাসাহিত্য, দৈনিক স্টেটসম্যান, যুগশঙ্খ, একদিন,,সুখবর ইত্যাদি এবং বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিনে নিয়মিত তাঁর সাহিত্যকীর্তি অব্যাহত। ইতিমধ্যে পাঁচটি গল্প সংকলন ও চারটি উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক "শতানীক " পত্রিকাটি দীর্ঘদিন ধরে সম্পাদনা করে আসছেন।
.jpg)