বাবলুর আজ স্কুল যাওয়ার কোনও তাড়া নেই। কারণ আজ সরস্বতী
পূজা। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, সে খুশি নয়। ঘরে বসে মোবাইলে স্ক্রল
করতে করতেই সে বিড়বিড় করছিল,
“এই সব পূজা-টুজা এখন আর লাগে? এসব
তো পুরনো দিনের ব্যাপার!”
ওর মা একজন প্রধান শিক্ষিকা, তিনি শুনে বললেন, “বাবলু,
এত বড় কথা বলার আগে একবার বোঝার চেষ্টা করো, কেন
আমরা এই পূজা করি। বিদ্যার দেবীর আরাধনা কেবল ধর্মীয় আচার নয়, এটি আমাদের সংস্কৃতির অংশ।”
বাবলু বিরক্ত হয়ে বলল, “মা, এসব বলে লাভ নেই। আমাদের ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে এসব হয় না, সবাই বলে এগুলো অলীক কল্পনা। বরং Halloween, Christmas,
Valentine’s Day অনেক বেশি মজার।”
মা একটু হাসলেন। তিনি বাবলুকে কাছে ডেকে বললেন, “শুধু একবার
আমার সঙ্গে আমাদের স্কুলে চলো। আমি তোমাকে একটা গল্প বলবো।”
বাবলুর মনখারাপ হলেও সে মার সঙ্গে গেল মার স্কুলে। পূজার মন্ত্র-ধ্বনির মাঝে মা
সকল ছাত্রদের উদ্দেশ্যে বলতে শুরু করলেন,
“প্রাচীনকালে, যখন ব্রহ্মা সৃষ্টিকর্তা হিসেবে পৃথিবী
তৈরি করছিলেন, তখন তিনি দেখলেন যে তাঁর সৃষ্ট জগত নিস্তব্ধ,
নির্জীব ও অগোছালো। মানুষ ছিল, প্রাণী ছিল,
প্রকৃতি ছিল, কিন্তু কেউ কথা বলতে পারত না,
কেউ কিছু বুঝতে পারত না।
ব্রহ্মা তখন গভীর চিন্তায় পড়লেন। তিনি ভাবলেন, ‘এই জগতে প্রাণ
আছে, কিন্তু কোনও সুর নেই, কোনও জ্ঞান
নেই, কোনও সংগীত নেই। তাহলে এই সৃষ্টির কি অর্থ?’
তখন তিনি তাঁর কমণ্ডলু থেকে এক জলধারা ছিটিয়ে দিলেন। সেই
জলধারা থেকে এক দেবীর আবির্ভাব হল। তিনি শুভ্র বসনে সজ্জিত, হাতে বীণা,
অক্ষমালা ও পুস্তক। তিনি বীণা বাজাতেই চারদিকে সংগীত ধ্বনিত হল,মানুষ কথা বলা শুরু করল,জ্ঞান অর্জনের ক্ষমতা পেল।
ব্রহ্মা তখন আনন্দিত হয়ে বললেন,”তুমি এই জগতের
জ্ঞান, সংগীত ও বিদ্যার উৎস, তোমার নাম
হবে সরস্বতী!”
সকলেই মনোযোগ দিয়ে দিদিমণির কথা শুনছিল। তাদের চোখে এক
অদ্ভুত কৌতূহল ফুটে উঠল।
দিদিমণি আরও বলতে লাগলেন,
“একবার দেবতা ও অসুরদের মধ্যে এক ভয়ানক যুদ্ধ বাঁধে। অসুররা ছিল দৈহিক
শক্তিতে প্রবল,কিন্তু তারা ছিল নির্বোধ। দেবতারা সরস্বতীর
শরণাপন্ন হলেন। সরস্বতী দেবী জানতেন, কেবল অস্ত্র দিয়ে সব
কিছু জয় করা যায় না, বুদ্ধিই হল সবচেয়ে বড় অস্ত্র।
তাই তিনি অসুরদের রাজ্যে গিয়ে মধুর ভাষায় বললেন, ‘তোমরা তো
পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ, তোমাদের চেয়ে জ্ঞানী আর কেউ নেই!’
অসুররা আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেল। তারা নিজেদের মধ্যে
ঝগড়া শুরু করল—‘কে শ্রেষ্ঠ?’
এই বিভ্রান্তির সুযোগে দেবতারা তাদের পরাজিত করল।”
বাবলু এবং ছাত্রছাত্রীরা এবার সত্যিই অবাক। সে ভাবতে
লাগল, “শুধু শক্তি থাকলেই চলে না, বুদ্ধি ও জ্ঞান থাকাটাও
দরকার।”
দিদিমণি এবার অন্য গল্প শোনালেন।
“একদিন সরস্বতী দেবী বিষ্ণুর কাছে অভিযোগ করলেন, ‘মানুষ
গঙ্গার জলে স্নান করেই পাপ-মুক্ত হয়, কিন্তু জ্ঞান অর্জনের
জন্য তেমন চেষ্টা করে না।’
বিষ্ণু বললেন, ‘যারা মোক্ষ চায়, তারা
গঙ্গার শরণ নেবে। আর যারা প্রকৃত জ্ঞানের সন্ধানী, তারা
তোমার পূজা করবে।’
এই গল্প থেকে বোঝা যায়, জ্ঞান ও
মোক্ষের পথ আলাদা। কেউ যদি প্রকৃত শিক্ষা ও সত্যকে গ্রহণ করতে চায়, তবে সরস্বতীর পূজা করা দরকার।”
বাবলু এবার মাথা নিচু করে বলল, “তাহলে কি
জ্ঞান মানেই শুধু বই পড়া?”
মা হাসলেন, “না, জ্ঞান মানে
শেখা, বোঝা, সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া।
বিদ্যা কেবল পরীক্ষায় ভালো ফল করা নয়, বরং জীবনকে গঠন করার
শক্তি।”
দিদিমণি আরও বললেন,
“একসময় সরস্বতী নিজেকে নিয়ে একটু অহংকার-বোধ করলেন। তিনি ভাবলেন, ‘আমি জ্ঞান ও বিদ্যার দেবী, আমাকে ছাড়া জগতে কিছুই সম্ভব নয়।’
গণেশ তখন বললেন, ‘কিন্তু যদি জ্ঞান অহংকারে পরিণত
হয়, তবে তা ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়।’
তিনি সরস্বতীকে অভিশাপ দিলেন, ‘অনেক মানুষ
তোমার পূজা করলেও, সবাই প্রকৃত জ্ঞান পাবে না।’
এই কাহিনী আমাদের শেখায়, শুধুমাত্র পূজা
করলেই নয়, জ্ঞানের জন্য আন্তরিক সাধনা ও নম্রতা দরকার।”
বাবলু এবার সত্যিই বুঝতে পারল, শুধু মোবাইল
ঘেঁটে সময় নষ্ট করাই সব নয়, বরং শেখার মানসিকতা থাকা দরকার।
দিদিমণি বললেন, “আজকের দিনে প্রযুক্তি আমাদের
অনেক কিছু সহজ করে দিয়েছে,কিন্তু আমাদের নিজেদের ঐতিহ্য ভুলে
গেলে চলবে না। আমাদের স্কুলগুলোতে Halloween, Christmas, Valentine’s Day পালন হয়, অথচ সরস্বতী পূজা হয় না। তাই তোমাদের মতো
নতুন প্রজন্মেরই দায়িত্ব, নিজেদের সংস্কৃতিকে রক্ষা করা।”
বাবলু এবার মা’কে জিজ্ঞাসা করল, “তা হলে আমি কি
করতে পারি?”
মা মৃদু হেসে বললেন, “সবার আগে
নিজের শিক্ষাকে গুরুত্ব দাও, বই পড়ো, নতুন
কিছু শেখার চেষ্টা করো। আর সরস্বতী পূজার দিনে অন্তত এই উপলক্ষে বিদ্যার প্রতি
শ্রদ্ধা রেখো।”
পূজা শেষে বাড়ি ফিরে আসার সময় বাবলু ভাবছিল, “আমি এতদিন
মোবাইলে ডুবে থেকে আমার সময় নষ্ট করেছি। মা ঠিকই বলেছে, বিদ্যা
শুধু পরীক্ষার জন্য নয়, জীবনের জন্য।”
সে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল, প্রকৃত জ্ঞান
অর্জনের চেষ্টা করবে, এবং সরস্বতী পূজার দিন থেকে নতুন কিছু
শেখার অভ্যাস গড়ে তুলবে।
বিদ্যা, শিক্ষা ও সংস্কৃতির আলোয় আলোকিত হওয়ার
শপথ নিয়েই বাবলু নতুন করে তার পথচলা শুরু করল…
পুনঃ
- কাহিনী বিভিন্ন তথ্য থেকে সংগৃহীত
.jpg)