Advt

Advt

amar-baba-galpo-story-by-bama-chakraborty-tatkhanik-digital-bengali-web-bangla-online-e-magazine-আমার-বাবা-গল্প-বামা-চক্রবর্তী

 

amar-baba-galpo-story-by-bama-chakraborty-tatkhanik-digital-bengali-web-bangla-online-e-magazine-আমার-বাবা-গল্প-বামা-চক্রবর্তী

আজ সকালবেলা নন্দকুমার ডাক্তারবাবুকে ফোন করে জানালেন যে বাবা ৪:৩০ মিনিটে পরলোক গমন করেছেন ডাক্তার বাবু বললেন,আমি আধ ঘণ্টার মধ্যে আসছি ! ডাক্তারবাবু নন্দকুমারের বাড়িতে পৌঁছে বাবার হাতটা ধরে বললেন, হ্যাঁ উনি আর নেই ! নন্দকুমারের বাড়িতে রয়েছে তার স্ত্রী রোহিনী ও দুই ছেলে মেয়ে। ওর সুখের সংসার, তার বাবা বছর খানেক ধরে বিছানায় অসুস্থ ছিলেন, বয়স হয়েছিল ৮০ । ডাক্তারবাবু রোহিনী ও নন্দকুমারকে সান্ত্বনা দিয়ে  বললেন দুঃখ করো না, বয়স হয়েছিল এবং তোমরা যথেষ্ট সেবাযত্ন করেছ, আর কিছু করার নেই । নন্দকুমারকে ডাক্তারবাবু বললেন, আমি ওনার ডেথ সার্টিফিকেটটা পরে পাঠিয়ে দেবো। নন্দকুমার বলল ঠিক আছে । ডাক্তারবাবু তখন ওখানে বসে আর আশেপাশের লোকেরা যাওয়া আসা করছে । নন্দকুমার তখন ওর বাড়িতে খবর দিয়েছে, সেই মুহূর্তে দুজন রোহিণীর সম বয়সী মহিলা এসে বলল, জানতো বৌদি আমরা এতদিন জানতাম উনি  দাদার বাবা, গতকাল শুনলাম উনি……, তখন রোহিনী বলল হ্যাঁ উনি দাদার নন “আমার বাবা" ।

মহিলা দুজনে বলল, তাইতো আমরা অবাক হলাম !   তখন ডাক্তারবাবু চেয়ারে বসে ভাবতে লাগলেন বছর চারেক আগে একদিন রোহিণীর বাবা খুব  অসুস্থ হয়ে পড়েন, রোহিনী ও নন্দকুমার দুজনে ওনাকে আমার চেম্বারে নিয়ে আসে, সেই থেকে ওনার চিকিৎসা করলাম এবং তখন থেকে উনি আমার কাছে মাঝে মাঝে চলে আসতেন, রাস্তায় দেখা হলে গল্প গুজব হতো । রোহিণীর বাবার ব্যবহার খুব ভালো ছিল, অতি বিনম্র এবং জ্ঞানী ব্যক্তি ছিলেন । আমিও মাঝে মধ্যে এদের বাড়ি যাতায়াত করতাম । রোহিনী বাবাকে খুব ভালোবাসে, আজকালকার দিনে এত ব্যস্ত জীবন মানুষের, তার মধ্যেও একজনকে এতটা সময় দেওয়া সত্যি প্রশংসনীয় । বছর খানেক ধরে উনি বিছানায় অসুস্থ ছিলেন । একদিন রোহিণীর বাবাকে দেখে যখন বেরচ্ছি তখন রোহিনী আমার সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে গেট পর্যন্ত এলো ও জিজ্ঞেস করল আমার বাবা ঠিক হয়ে যাবেন-তো, এবং কাঁদতে লাগলো । ডাক্তারবাবু  রোহিণীকে বললেন কেঁদোনা, দেখো সব ভগবানের ইচ্ছে । তখন রোহিনী চোখ মুছতে মুছতে আমাকে তার গল্প বলল ।

রোহিনী বলল, জানেন উনি কিন্তু খুব ভালো মানুষ, আমি ছোট থেকে ওনার কাছে প্রচণ্ড স্নেহ মমতা পেয়েছি, ওনি আমাকে বাবা ও মা দুজনের ভালবাসা দিয়ে মানুষ করেছেন, লেখাপড়া শিখিয়ে নন্দকুমারের সঙ্গে আমার বিয়ে দিলেন । উনি নন্দ ও আমার ছেলে মেয়েকে খুব ভালোবাসেন, আমার মনে পড়েনা আমাকে কোনদিন বকাবকি করেছেন । উনি আমার বাবা কিন্তু আমি ওনার মেয়ে নই, আজ থেকে ৩২ বছর আগেকার কথা, আমার বাবা চালতা পাড়া থেকে মধুপুর   ওনার স্ত্রী ও ছেলেকে আনতে যাবেন বলে বাসে উঠে বসলেন, পাশের সিটে একজন মহিলা একটা ছোট বাচ্চা কোলে নিয়ে বসে রয়েছেন, বাচ্চাটা মাস  দুইয়েকের এর হবে । বাস ছাড়ল, ঘণ্টা খানেক চলার পর একটা বাস স্ট্যান্ড এলো, বাস দাঁড়াল, সেখান থেকে চালতা পাড়া আরও দুই ঘণ্টার রাস্তা, ঠিক সেই সময় বাবার পাশে বসে থাকা মহিলা ওনাকে বাচ্চাটা কোলে দিয়ে বললেন, বাবা একটু ধর আমি ওর জন্য একটু গরম জল নিয়ে আসি। বাবা হ্যাঁ না বলার আগেই বাচ্চাটা কোলে দিয়ে ঐ মহিলা বাস থেকে নেমে পড়লেন, বাস ছাড়বে ছাড়বে, কিন্তু ওনি আর আসছেন না। তখন বাবা বাচ্চাটাকে নিয়ে বাস থেকে নীচে নামলেন এবং সেই মহিলাকে চারদিকে খুঁজতে লাগলেন, কিন্তু কোথাও তাঁকে দেখতে পেলেন না, তখন বাস স্ট্যান্ডের লোকেরা বলল, কাকে খুঁজছেন ? তখন বাবা সেই মহিলার বিবরণ দিলে, সেখানকার লোকেরা বলল, আরে ঐ মহিলাতো অন্য বাসে ওঠে চলে গেল । বাবা সেই মহিলাকে ধরার জন্য তার পরের বাসে ওঠে রওনা দিলেন । শেষমেশ মধুপুরে সেই বাসটাকে দেখতে পেলেন আর কাছে গিয়ে সেই মহিলার কথা জিজ্ঞেস করলে, কন্ডাক্টর বলল সে অনেক আগেই পথে নেমে গেছে । বাবা কি করবেন না করবেন ভাবতে ভাবতে শেষে শ্বশুরবাড়ী গিয়ে উঠলেন । বাড়িতে ওনার স্ত্রী, ছেলে ও বাকি সদস্যরা বাবার কোলে আমাকে দেখে অবাক হল । তারপর বাবার মুখে সমস্ত কথা শুনে বলল ঐ মহিলা ইচ্ছে করে তোমাকে দিয়ে গেছে । ঠিক আছে আমরা ওকে  অনাথ আশ্রমে দিয়ে দেব । কিন্তু বাবা তাতে রাজি হলেন না । কয়েকমাস ওনার স্ত্রী ও ছেলের সঙ্গে আমাকে নিয়ে ঝগড়া ঝামেলা চলল, শেষে ওনার স্ত্রী রাগ করে ছেলেকে নিয়ে বাড়ী ছেড়ে চলে গেলেন । এদিকে বাবা যে মহিলা আমাকে ওনার কোলে দিয়েছিল তার অনেক খোঁজ করলেন কিন্তু কোথাও পেলেন না । আমি বড় হওয়ার পর ওনার স্ত্রী ও ছেলের সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করলাম, কিন্তু ওনারা আমার সঙ্গে দেখা করা বাঁ কথা বলতে রাজি হলেন না । কারণ আমার জন্য ওনার সংসার নষ্ট হয়ে গেছে, ওদের ফিরিয়ে আনার অনেক চেষ্টা করেও সফল হতে পারিনি । আমার বড় হতে এবং সব কিছু বুঝে ঠতে অনেক বছর কেটে যায়, তখন কি কেউ আর ফিরে আসে!

পরে নন্দকুমারের সঙ্গে আমার বিয়ের সময় আমি আগে সব বলেছিলাম এবং এও বলেছিলাম বাবা সব সময় আমাদের সঙ্গে থাকবেন। নন্দ ও ওর বাবা মা সকলে এতে রাজি হয়ে যান, সেই থেকে আমার বাবা আমার সঙ্গে ।  

শেষ

 

লেখিকার পরিচিতি

জন্ম বিহারের কিশানগঞ্জ-এ। প্রাথমিক থেকে স্নাতকোত্তর পর্যন্ত পড়াশোনা কিষানগঞ্জেই। আঞ্চলিক বার্ষিক পত্রিকা, ই-ম্যাগাজিন তাৎক্ষনিক ডট কমে অণুগল্প, ছোট গল্প, প্রবন্ধ লেখালেখি করেন । ওনার প্রথম গ্রন্থ ‘নবরত্ন’(গল্পগুচ্ছ)। বই পড়া, ভ্রমণ ও আধ্যাত্মিকতায় রুচিশীল এবং কুসংস্কার বিরোধী ।