ঊনবিংশ শতাব্দীর ভারতের নবজাগরণের ইতিহাসে রাজা রামমোহন
রায়ের পর যে মহান ব্যক্তিত্ব চির প্রতিষ্ঠিত হয়ে আছে তিনি হলেন ঈশ্বরচন্দ্র
বিদ্যাসাগর । বাংলা তথা ভারতের জীবন স্পন্দনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পুরুষ । একাধারে মাতৃ-পিতৃ
ভক্ত সন্তান,কর্তব্যশীল দক্ষ প্রশাসক অপরদিকে সমাজ সংস্কারক-শিক্ষা প্রসারক উদার
হৃদয়ের এক যুগান্তকারী মহামানব। বাংলার নারী ও আদিবাসীদের জীবন্ত দেবতা, বাঙালির জীবন দার্শনিক। ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় ভারতের উন্নত সমাজ
গঠনের এক আলোকবর্তিকা ।
বিদ্যাসাগর
সমগ্র জীবনে ছিলেন ক্লান্তিহীন এক কর্মযোগী। পরাধীন কুসংস্কার সমাজ এবং
অশিক্ষার বিরুদ্ধে তিনি হলেন এক
পথনির্দেশক। বাল্যবিধবা, অসহায়
ক্ষুধার্ত আদিবাসীদের এক বিশ্বস্ত আশ্রয়স্থল ছিল বিদ্যাসাগরের কর্মভাবনা। একাধারে
কুসংস্কারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী সত্তা তিনি,বাল্যবিধবাদের
চোখের জল মোছানোর বিশ্রামহীন লড়াইয়ের সৈনিক,স্ত্রী শিক্ষার
প্রসারের পথ নির্দেশক,অপরদিকে বাংলার সাহিত্য জগতে নূতন
নূতন ধারার স্রষ্টা হলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ।
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের জীবন কর্মের বহু আলোচনার মধ্যে
অন্যতম প্রসঙ্গ হল কর্মাটার। তাঁর শেষ জীবনের প্রায় সতেরো - আঠারো বছর তিনি কর্মাটারে
কাটিয়েছেন এলাকার আদিবাসীদের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে । জীবনের পড়ন্ত বেলায় কমবেশি
দু’দশক বিদ্যাসাগর কাটিয়েছিলেন তৎকালীন বর্তমান ঝাড়খণ্ডের
জামতারা ও মধুপুর স্টেশনের মধ্যবর্তী সাঁওতাল অধ্যুষিত অঞ্চল কর্মাটারে। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সাথে পিছিয়ে পড়া অন্ধকারাচ্ছন্ন আদিবাসী
অধ্যুষিত অঞ্চল কর্মাটারের সঙ্গে সম্পর্ক হল ভারতের সমাজ গঠনের ইতিহাসে এক
বিস্ময়কর অধ্যায় ।
বিভিন্ন বিদ্যাসাগর গবেষকদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য থেকে
জানা যায় যে ১৮৭১-৭২ মতান্তরে ১৮৭৩ খ্রিস্টাব্দে বিদ্যাসাগর কর্মাটরে এসেছিলেন।
তখন তার বয়স ছিল ৫৩ বছর । বিদ্যাসাগরের তৃতীয় কন্যা বিনোদিনীর পৌত্র সন্তোষ
কুমার অধিকারী তাঁর 'বিদ্যাসাগরের শেষ ইচ্ছা 'গ্রন্থে
লিখেছেন - "অত্যন্ত নির্জন ও স্বাস্থ্যকর স্থান তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন কর্মাটারে । ১৮৭৩- ৭৪ সালে এই কর্মটারে জমি কিনে বসবাসের জন্য একটি বাড়ি তৈরি
করেন এবং সেখানে পর্যায়ক্রমে সতেরো বছর থেকেছেন ও নানারকম জনসেবামূলক কাজে
আত্মনিয়োগ করেছেন।" কলকাতার মতন আভিজাত্যের শহর ছেড়ে কেন বিদ্যাসাগর
অনুন্নত কর্মাটার এসেছিলেন সে সম্পর্কে বহু বিদ্যাসাগর গবেষকগণ উল্লেখ করেছেন
প্রধানত চারটি কারণ বা প্রেক্ষাপট ।
প্রথমত
(স্বাস্থ্যোদ্ধার) :-- ভারতবর্ষে নারী শিক্ষা বিস্তারের ইচ্ছায় মিস মেরী
কাঁপেনটার এর সঙ্গে বিদ্যাসাগর ১৪- ১২ - ১৮৬৬ সালে উত্তরপাড়া গিয়েছিলেন বালিকা
বিদ্যালয় দেখতে এবং ফেরার পথে তাদের বগী গাড়ি উল্টে যাওয়ায় বিদ্যাসাগর
মারাত্মক রকম ভাবে আহত হন । তাঁর যকৃতে জোরে আঘাত লাগার জন্য তাঁর স্বাস্থ্য ভাঙতে
শুরু করে । পরবর্তীকালে বিদ্যাসাগরকে স্বাস্থ্যকর স্থানে শারীরিক ও মানসিক
বিশ্রামের জন্য তার ডাক্তাররা পরামর্শ দেন এবং সেই সূত্রেই তাঁর কর্মাটারে
আগমন বলে অনেকে মনে করেন । কর্মাটার স্টেশন যা বর্তমানে বিদ্যাসাগর স্টেশন নামে
পরিচিত সেখানকার মর্ম ফলকে বিদ্যাসাগরের কর্মাটারের আগমনের সময় উল্লিখিত রয়েছে
১৮৭৪ খ্রিস্টাব্দ ।
দ্বিতীয়ত (পরিবারের সদস্যদের কৃতঘ্ন আচরণ):---
ঈশ্বরচন্দ্র পরিবারের সকল সদস্যদের প্রতি সমানভাবে
দায়িত্ব পালন করার পরও প্রায় সকলের কাছ থেকে কম বেশি কৃতঘ্ন আচরণ ছাড়া কিছু
পাননি । ১২৭৬ বঙ্গাব্দের ১২ ই অগ্রহায়ণ তিনি তাঁর মাতৃদেবীকে একটি চিঠি লেখেন
গভীর মানসিক যন্ত্রণা নিয়ে - " নানা কারণে আমার মনে বৈরাগ্য জন্মিয়াছে ।
সাংসারিক কোন বিষয়ে লিপ্ত থাকিতে বা কাহারো সহিত কোন সংস্রব রাখিতে ইচ্ছা নাই ।
ইদানীং আমার মনের ও শরীরের যেরূপ অবস্থা ঘটিয়াছে তাহাতে অধিক দিন বাঁচিবো এরূপ
বোধ হয় না । এজন্য স্থির করিয়াছি যতদূর পারি নিশ্চিন্ত হইয়া জীবনের অবশিষ্ট ভাগ
নিভৃতভাবে অতিবাহিত করিব । আপনার শ্রী চরণে এ জন্মের মতো বিদায়
লইতেছি......"। অর্থাৎ মনের শান্তির জন্য তিনি যে নির্জন স্থানের খোঁজ করেছিলেন
সেই জায়গাটি হল এই কর্মাটার ।
তৃতীয়ত ( সমাজের বহু নামী অনামি মানুষের দ্বিচারিতা
):----সমাজ সংস্কারের বহু কাজ করতে গিয়ে বিশেষত বিধবা বিবাহ প্রচলনের ক্ষেত্রে
তৎকালীন বাংলার বহু মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত
শ্রেণীর ব্যক্তিরা বিরুদ্ধচারণ করেছিলেন,যা বিদ্যাসাগরের হৃদয়কে রক্তাক্ত
করেছিল । তাঁকে সহযোগিতা দানের অঙ্গীকার করেও পিছিয়ে গিয়েছিলেন তাহারা নানা
কৌশলে । এরূপ একাধিক ঘটনায় মর্মান্তিকভাবে আহত হয়েছিলেন
বিদ্যাসাগর। শেষ জীবনে তিনি বলতেন-- " এদেশের উদ্ধার হইতে বহু বিলম্ব আছে ।
পুরাতন প্রকৃতি ও প্রবৃত্তি বিশিষ্ট মানুষের চাষ উঠাইয়া
দিয়া সাত পুরু মাটি তুলিয়া ফেলিয়া নূতন মানুষের চাষ করিতে পারিলে তবে এদেশের ভালো হয় ।" একরাশ অভিমান
নিয়ে তিনি চলে আসেন কর্মাটারে ।
চতুর্থত (
পিছিয়ে থাকা আদিবাসীদের উন্নয়নে সহযোগিতা ) :---সাঁওতাল বিদ্রোহ ও
পরবর্তী সময়ে আদিবাসীদের করুন অবস্থায় পরিণত হয় । বিদ্যাসাগর তাঁদের এই অবস্থার
জন্য ভীষণ রকম ভাবে মর্মাহত হন । শিক্ষা- স্বাস্থ্য এবং সর্বোপরি উপযুক্ত খাদ্য
বাসস্থানের জন্য সক্রিয় হন তিনি। সেই উদ্দেশেই তৎকালীন সাঁওতাল পরগনা অঞ্চলের
এই কর্মাটরে তার আগমন বলে বিশিষ্ট গবেষকগণ মনে করেন ।
স্বার্থপরতা দ্বিচারিতা হিংসা বিদ্বেষের কোলাহল ছেড়ে
একান্ত নির্জন আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চল কর্মাটারে এসে বিদ্যাসাগর তৈরি করেছিলেন
মানবতার' নন্দনকানন'। এক বিদেশিনির কাজ থেকে চার পাঁচ বিঘা
জমি পাঁচশো টাকায় কিনে তৈরি করেছিলেন চারটি ঘর ও বারান্দা,
বিভিন্ন ফুল,ফলের গাছের সমাহার, বিদ্যালয়,দাতব্য হোমিওপ্যাথি চিকিৎসাকেন্দ্র
প্রভৃতি । ১৮৭৫ খ্রিস্টাব্দে বিদ্যাসাগরের মধ্যম ভ্রাতা শম্ভুচন্দ্র একবার কর্মাটর
গিয়েছিলেন । তাঁর লেখা থেকে জানা যায় যে--" বিদ্যাসাগর ভোর থেকে সকাল দশটা পর্যন্ত
সাঁওতালদের হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা করেন ওষুধ দেন । পথ্যের জন্য সাগু বাতাসা মিছরি
দেন এরপর খাওয়া-দাওয়া সেরে বাগানে গাছপালা দেখার পর বই লেখায় মনোনিবেশ করেন ।
বিকালবেলা সাঁওতাল গ্রামে গিয়ে তাদের ঘরে ঘরে খবর নেওয়া সাহায্য করা প্রভৃতি কাজ
করিতেন।"
এছাড়া শম্ভুচন্দ্রের 'বিদ্যাসাগর
চরিত্র' থেকে আরও জানা যায় যে,- প্রতিবছর
শীতকালে সাঁওতালদের জন্য শীতবস্ত্র কম্বল চাদর এবং সেই সঙ্গে প্রচুর কমলালেবু,খেজুর কলকাতা থেকে কিনে নিয়ে যেতেন ও নিজের হাতে তাদের বিলোতেন । ইন্দ্র
মিত্রের লেখা থেকে আরও জানা যায় যে কর্মাটারের একদিন সকালবেলা এক মেথর এসে
বিদ্যাসাগরকে জানালো যে তার স্ত্রী ম্যাথরাণীর কলেরা হয়েছে সেই কথা শুনে তিনি
তৎক্ষণাৎ ওষুধের বাক্স আর একটি বসার মোড়া নিয়ে রওনা দিলেন । সাধ্যমত ওষুধ
দেওয়ার পর সেই রোগিণীকে কিছুটা সুস্থ করার পর প্রায় সন্ধ্যায় নন্দনকাননে ফিরে
এসে স্নানাহার করেন। অর্থাৎ এই অঞ্চলের মানুষের চিকিৎসার জন্য সবসময় সচেষ্ট ছিলেন
আদিবাসীদের দেবতা বিদ্যাসাগর মহাশয়।
কর্মাটার এবং পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের সাঁওতালদের জন্য
শুধুমাত্র খাবার যোগান বা চিকিৎসা ওষুধই নয় তারা যাতে ঠিকমতো শিক্ষা পায়
তার জন্য তিনি সচেষ্ট ছিলেন সবসময় । সেখানে তিনি কম খরচে বিদ্যালয় স্থাপন
করেছিলেন । বর্তমানে নন্দনকাননের ভেতরে যেখানে বিদ্যাসাগরের আবক্ষ মূর্তিটি রয়েছে
কথিত আছে সেই জায়গায় একটি মাটির বেদী ছিল এবং সেখানে বসে শিশু বয়স্ক পুরুষ
মহিলা প্রত্যেককে লেখাপড়া শেখাতেন বিদ্যাসাগর ।
কর্মাটরের প্রতি ঈশ্বরচন্দ্রের ছিল এক অদ্ভুত টান ।
কাজের চাপের জন্য একটানা সেখানে থাকতে না পারলেও সব সময় তার মন পড়ে থাকত সেখানে
। বিদ্যাসাগর প্রায়ই বলতেন তাঁর বন্ধু স্থানীয়দের --" এরা গালি দিলেও আমার
তৃপ্তি । ওরা অসভ্য বটে কিন্তু সরল ও সত্যবাদী।"
ইন্দ্রমিত্রের 'করুন সাগর বিদ্যাসাগর' গ্রন্থ থেকে জানা যায় তৎকালীন কলকাতার হাইকোর্টের উকিল শিবা প্রসন্ন
ভট্টাচার্য একবার কলকাতার বাড়িতে বিদ্যাসাগরকে দেখতে এলে কথোপকথনের সময় কর্মাটরের অবস্থার কথা জানতে চাইলে বিদ্যাসাগর এক বড় দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে
বললেন -" যদি আমার ঐশ্বর্য থাকিত তাহলে সেখানে গিয়ে নিশ্চিন্তে থাকিতে
পারিতাম। আমি এখানে ভালো-মন্দ খাব আর ওখানে আদিবাসীরা না খেতে পেয়ে মারা যাবে
"-কথাগুলো বলতে বলতে তিনি ডুকরে ডুকরে কাঁদতে লাগলেন । "
বহু ঘটনার সাথে সম্পর্কিত বিদ্যাসাগরের স্মৃতি বিজড়িত কর্মাটার । এই
স্থানকে কেন্দ্র করে বিদ্যাসাগর শুরু করেছিলেন
প্রকৃত বাংলার সমাজচিত্র তৈরি করতে
নিঃস্বার্থ মানুষের জন্য। বীরসিংহ থেকে কলকাতা তার দীর্ঘ কর্মজীবনে পেয়েছিলেন
অনেক কিছু,শুধু পাইনি, প্রকৃত
নিঃস্বার্থ ভালোবাসা আর প্রকৃত
সম্মান। পিছিয়ে থাকা অভুক্ত অশির
অন্ধকারে জীবন কাটানো কর্মাটরের সাঁওতালদের কাছ থেকে প্রকৃত
অর্থেই পেয়েছিলেন সততা সরলতা। শিখেছিলেন জীবনের প্রকৃত সংজ্ঞা। তাঁর দীর্ঘ সতেরো
বছরের কর্মাটার অধ্যায় ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়কে তৈরি
করেছিল মহামানবে ।
১৮৯১ সাল বাংলার ১২৯৮ সনের পর থেকে কর্মাটার অঞ্চলের
আবাল -বৃদ্ধ -বণিতা আদিবাসীরা অপেক্ষা করে থাকতো তাদের দেবতা বিদ্যাসাগরের জন্য।
কিন্তু বিদ্যাসাগর আর পুনরায় সেখানে ফিরতে পারেনি ।
কালের গর্ভে সেদিনের কর্মাটরের আজ
হয়তো অনেকটাই উন্নতি হয়েছে । সমগ্র অঞ্চলের জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন
ঘটেছে কিন্তু নন্দনকানন আজও খুঁজে বেড়ায় একটি মানুষকে দয়ার সাগর বিদ্যাসাগরকে ।
।
তথ্যসূত্র:-----
১...
করুনা সাগর বিদ্যাসাগর-- ইন্দ্র মিত্র ।
২..
বিদ্যাসাগর অন্বেষণ অনুভব প্রীতিতী--অশোক পাল ।
৩..
বিদ্যাসাগর ও কর্মাটার--- ডঃ সুভাষ রায় ।
ঋণ
শিকার---- ড:হরগোবিন্দ দলুই (বিশিষ্ট বিদ্যাসাগর গবেষক ,বীরসিংহ )
লেখকের অন্যান্য লেখা পড়তে এখানে ক্লিক করুন ।
লেখক
পরিচিতি -
অরিজিৎ হাজরা,পশ্চিমবঙ্গের
বীরভূম জেলার সদর শহর সিউড়িতে বসবাস করেন । দীর্ঘ ২১ বছর ধরে শিক্ষকতার
কাজে নিয়োজিত। নেশা হচ্ছে লেখালেখি এবং
তথ্যের অনুসন্ধান করা। একজন প্রাবন্ধিক গল্পকার হিসেবেই বেশি পরিচিত ।
