ধারাবাহিক উপন্যাস – প্রতি রবিবার
পর্ব - ৩
দিন তিনেক পরে হারুর দোকানে আবার প্রচন্ড সোরগোল উঠল। জানলা খুলে অবিনাশবাবু দেখলেন দুটো লোক প্রায় উলঙ্গ অবস্থায় দোকানের সামনে ধ্বস্তাধস্তি করছে। অন্যান্য মাতালদের কেউ শিস দিচ্ছে, কেউ চেঁচিয়ে যুদ্ধমান দুই পক্ষকে উৎসাহ দিচ্ছে আবার কেউবা নেশার ঝোঁকে মদের গেলাস পাশের কারও মাথায় উপুর করছে।
“ নরক!” বলে সুধাময়ী জানলা
বন্ধ করলেন।
বাবলু বড় বড় চোখ করে বলল, “ বাবা ওরা
কি এখন পশু হয়ে গেছে?”
“ হ্যাঁ, দেখলেনা
ওরা কী করছে? পশু ছাড়া ওরকম করতে পারে?” অবিনাশবাবু
একটু রুক্ষভাবেই জবাব দিলেন। কয়েকদিন আগের ঘটনাটা তার মনে পড়লস। যারা এখন হারু
ঘোষের দোকানের সামনে বীভৎস ফূর্তিতে মেতে আছে ঘরে ফিরে খাবার চেয়ে না পেলে এরাই
বউকে ধরে ঠ্যাঙাবে। আর হারু ঘোষ? অমায়িক
হাসিটি ঠোঁটে ঝুলিয়ে গেঞ্জি কলের কুলি কামিন মজুরদের মদের নেশায় ডুবিয়ে রেখে দিনকে
দিন নিজের পকেট স্ফীত করতে থাকবে। মজুরদের ঘরের দাঙ্গা হাঙ্গামার কোন আঁচ তার গায়ে
লাগবেনা। এ নিষ্ঠুরতার সাজা হওয়া উচিৎ, অবিনাশবাবুর
মনে হল। তিনি বাবলুকে পাশের ঘরে ডেকে বললেন, “ আমি একটু
বেরোচ্ছি। মাকে বলিস ‘বাবা বেঁটে বোসের বাড়িতে গেছে দাবা খেলতে।”
অবিনাশবাবু যখন হারুর দোকানের সামনে রুমাল নাকে
চাপা দিয়ে দাঁড়ালেন লড়াইটা তখনও চলছে। জল মাটি কাদা মেখে দুটো মাতাল তখনও সমানে
কুস্তি করে যাচ্ছে। তবে অন্যান্য মাতালদের উৎসাহে কিছুটা ভাটা পড়ে যাওয়াতে লড়াইটা
জমছেনা। অবিনাশবাবু উঁচু গলায় বললেন, “ এটা কী
হচ্ছে হারু?”
“ এজ্ঞে একটু তামাসা হচ্ছে,” হারু
বিনীতভাবে জানাল।
“ এই তামাসা তোমার বন্ধ করতে
হবে,” অবিনাশবাবু দৃঢ়ভাবে বললেন।
“ এজ্ঞে?” হারু
গোবেচারা মুখ করে বলল, যেন সে ঠিক কথাটা বুঝতে
পারেনি।
“ আমি বলছি এই বীভৎস
রঙ্গ-তামাসা তোমাকে বন্ধ করতে হবে,” অবিনাশবাবু
আরও উঁচু গলায় বললেন। হারু ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
“ তা আমি কী করতে পারি বলুন
স্যার? এরা আমার কথা শুনবে কেন?”
“ তুমি উৎসাহ না দিলে এরা
বেলাল্লাপানা করতে সাহস পেতনা।”
হারু হঠাৎ মাতালগুলোর দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে
উঠল, “ শোন শালারা, শোন, তোদের
জন্য হারু ঘোষের বদনাম শুনতে হচ্ছে। কেটে পড় সব, এটা
ভদ্দরলোকের পাড়া, মাল খেয়ে টু শব্দটি করতে
পারবেনা, বুয়েচ?”
বেঞ্চের উপরে বসা এক বদ্ধ মাতাল জড়িত গলায়
আস্ফালন করে উঠল, “ বেশি লেকচার দিবিনা হারু।
নগদ পয়সা দিয়ে মাল খাই, তাও শালা তুই জল মেশাস। বেশি
খিঁচ খিঁচ করলে দোকান ভেঙে দিয়ে যাব বলে দিচ্ছি।”
আরেকটা মাতাল হেঁড়ে গলায় গেয়ে উঠল, “ আহা কী
করলি কী করলি ও স’দাগর/ তাড়ির ব্যবসা ছেড়ে দিয়ে মদের ব্যাবসা ধর।”
হারু গম্ভীরভাবে বলল, “ শুনলেন
স্যার? নিজের কানে শুনলেনতো স্যার? দোকান
ভেঙে দেবে বলচে, এর পর আমি কী করতে পারি বলুন?”
“ বেশ বলেছে, ওরা যদি
তোমার দোকান ভেঙে দেয়, ওদের আমি মিস্টি খাওয়াব।
মাইনের টাকা এখানে উড়িয়ে ঘরে গিয়ে বউ ঠ্যাঙাবে, ছেলেমেয়েকে
না খাইয়ে মারবে আর তুমি দু’হাতে পয়সা কামাবে সেটা কি ঠিক? ভগবান
কতদিন এ অন্যায় সইবেন?”
হারু ঘোষের ছোট চোখ কুঁচকে আরও ছোট হয়ে গেল।
অবিনাশবাবু এমন সোজাসুজি আঘাত করবেন হারু ভাবতে পারেনি। সে একটু চমকে উঠে তাঁর
চারপাশে, বিশেষভাবে তাঁর সামনের খোলা আলমারিতে সাজান মদের বোতলগুলো দেখে নিল।
“ তাই যদি মনে করেন স্যার তবে
ভাঙুননা আমার দোকান,” অনুদ্বিগ্ন কণ্ঠে হারু ঘোষ
বলল।
“ আমি ভাঙতে যাব কেন, ভাঙলে
ওরাই ভাঙবে তোমার দোকান। তবে আমি তোমাকে স্পষ্ট বলে যাচ্ছি হারু, যদি পারি
তোমার দোকান আমি তুলে দেব।”
অবিনাশবাবু দেখলেন পাড় মাতালগুলো কিছুক্ষণের
জন্য হলেও মাতলামি ছেড়ে হা করে তাঁর কথা শুনছে। স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে হারুর দোকানের
অস্তিত্ব থাকা না থাকার প্রশ্নে ওরা কম উদ্বিগ্ন নয়। একটু ব্যঙ্গ মিশ্রিত
তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে হারু বলল, “ তবে তা-ই
করুন স্যার। ভদ্দরলোকের পাড়ায় দেশি মালের দোকান ভাল দেখায়না, আমাকে
উঠিয়ে এখানে বরঞ্চ বিলিতি মালের দোকান লাগিয়ে দিন।”
অবিনাশবাবু রুক্ষভাবে বললেন, “ তোমার
সঙ্গে আমি মষ্করা করতে আসিনি হারু। আমি মদ খাইনা আর নীতিগত কারণে কারও মদ খাওয়া
সমর্থনও করিনা। কাজেই দিশি বিলিতি এসব বলে জল ঘোলা কোরনা।”
অবিনাশবাবু আর বাক্য ব্যয় করা অসমীচীন মনে করে
হারুর দোকান থেকে সরে এলেন। হঠাৎ পিছন থেকে শুনলেন হারু ডাকছে, “ একটা কথা
ছিল স্যার।”
অবিনাশবাবু ভ্রু কুঁচকে তাকালেন। হারু ঘোষ এক
গাল হেসে আমতা আমতা করে বলল, “ বলছিলাম কী স্যার . . . মানে
যদি কিছু না মনে করেন . . . এই মানে আপনি হলেন গিয়ে খাঁটি সাত্বিক মানুষ, তাড়ির
গন্ধ কি আর আপনি বেশি দিন সইতে পারবেন? তা আপনি
যদি আপনার বাড়িটা বেচে দিয়ে অন্যত্র চলে যান . . .।
হারুর ধৃষ্টতায় অবিনাশবাবু তেলে বেগুনে জ্বলে
উঠলেন। হারুর মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বললেন, “ ‘. . .তবে আমি
আপনার বাড়িটা কিনে নি’ এইতো? বাঃ চমৎকার প্রস্তাব। তবে
শুনে রাখ হারু বাড়ি বিক্রি করার মত অবস্থা এখনো আমার হয়নি। আর যদি কোনদিন হয়ও তো
তোমাকে আমি বিক্রি করবনা, সেটা তুমি ভালভাবেই জেনে
রেখ।”
“ তবু স্যার একটু ভেবে দেখবেন।
নাহয় অন্যকেই বিক্রি করবেন . . . ভাল দাম পাইয়ে দেব আপনাকে কথা দিচ্ছি।”
হারুর প্রস্তাবের মধ্যে কতটা ব্যঙ্গ এবং কতটা
সত্যিকার বাড়ি কিনবার আগ্রহ ছিল অবিনাশবাবু বুঝতে পারলেননা। হারুর দিকে একবার কটমট
করে তাকালেন তারপর কোনোরকম উত্তর না দিয়ে দ্রুত পায়ে বাড়ি ফিরে এলেন।
ক্রমশ …………
৪র্থ
পর্ব পড়ুন আগামী রবিবার
লেখক পরিচিতি –
জন্ম এবং শিক্ষা কলকাতায়; কর্মজীবন দিল্লিতে,
কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রালয়ে। গল্প লেখার শুরু ষাটের দশকের
শেষ দিকে। বাংলা এবং ইংরেজি দুই ভাষায় সাহিত্যচর্চা করে আসছেন গত পঞ্চাশ বছর ধরে।
ইংরেজিতে চারটি উপন্যাস ও একটি গল্প সংকলন এবং বাঙলায় চারটি উপন্যাস ও দু’টি
গল্পগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। বিবিসি থেকেও ওঁর কয়েকটি ইংরেজি গল্প প্রচারিত হয়েছে।
দেশ, আনন্দবাজার, সাপ্তাহিক বর্তমান,
নবকল্লোল, পরিচয়, কালি ও
কলম(বাংলাদেশ) এবং দিল্লি ও কলকাতার অনেক সাহিত্য পত্রিকায় গল্প লেখেন নলিনাক্ষ
বাবু। দিল্লি থেকে প্রকাশিত ‘ কলমের সাত রঙ’ পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত আছেন।
