- আপনি ?
- আমি বিপাশা রায়। ওই যে বকুল
গাছটার নিচে বসে যে ছেলেটা, প্রিয়ম, আমি ওর মা। আপনি ?
- আমি অনন্যা বসু। কোথায় গেল
বলুন তো আমার মেয়েটা ? এইমাত্র
মার্চপাস্ট করে এলো। প্রথমেই স্কুলের ফেস্টুন নিয়ে বড় বড় পা ফেলে হাঁটছিল যে মেয়েটা, ওই যে, ওই
যে, দেখতে পেয়েছি। কাছে আসুন। বেঞ্চে
উল্টো দিকে মুখ করে বসে রয়েছে, মাথায়
গোলাপি ফিতে, ওর নাম
সোনালী। আমি ওর মা।
- আপনার মেয়েকে তো এর আগে
দেখিনি !
- দেখেননি ? আমারও তো মনে পড়ছে না, আপনার
ছেলেকে দেখেছি বলে।
- আমার ছেলে তো এখানে
হোস্টেলে থাকে না। বাড়ি থেকে যাতায়াত করে। প্রাইভেট কারে।
- তাই বুঝি ? আমার মেয়েও বাড়ি থেকে আসা যাওয়া করে। এবার ভাবছি হোস্টেলে
রাখব। বদগোছের কিছু ছেলে রাস্তায় খুব বিরক্ত করে। ফরফর করে বেড়ে ওঠাটাই মেয়েটার
কাল হল। কতদিক সামলাবো বলুন তো ? মেয়েকে
শাসন করলে বুঝতে চায় না। বদ ছেলেগুলো তাতে আরও মজা পায়।
- পা থেকে চটি খুলে দেন না
কেন দু চার ঘা। দেখতেন ঠাণ্ডা হয়ে যেত। আমি হলে তো তাই করতাম।
- প্রিয়ম তো ছেলে, এটা বুঝুন। সোনালী যে মেয়ে। মেয়েদের বিরক্ত করা অনেক মজার।
তাই না ?
- মানছি। তবে কী জানেন, প্রিয়মের সিক্সথ সেন্স খুব প্রবল। ও চট করে ধরতে পারে কার
কী মোটিভ।
- সোনালীও মোটেই, আপনি যেমনটা ভাবছেন, বোকা-হাবা
তা নয়। তবে ওই যে বললাম, মেয়ে কিনা
! তার ওপর চেহারাটাও বড়সড়।
- এক্ষেত্রে গার্জেনকে কনশাস
হতে হবে। আর জানবেন ছেলেমেয়ের ক্ষেত্রে বাবাদের চেয়েও মায়েদের বেশি করে চোখ কান
খোলা রাখতে হয়।
- সেটা তো একশবার ঠিক। মেয়ের
ব্যাপারটা তো পুরোপুরি আমাকে দেখতে হয়। ওর বাবা সকালে বেরিয়ে রাত নটার পর বাড়ি
ফেরে। প্রাইভেট কোম্পানির চাকরি কিনা !
- প্রিয়মের তো আমাকে ছাড়া
চলেই না। এক এক সময় মনে হয়, বাবাকে ও
চেনেই না। ব্যবসার কাজে ওর বাবা আজ দিল্লী, কাল
বম্বে, পরশু বাঙ্গালোর।
- পেটে ধরার যন্ত্রণা সব
মায়েদেরই সামলাতে হয়। তাই না বিপাশা ?
- শুধু কি তাই। কালেভদ্রে
মেজাজ-মর্জি ঠিক থাকলে পাকা এক্সামিনারের মতো জানতে চায়, ছেলের ডেভেলপমেন্ট কেমন হচ্ছে। নতুন কী শিখল। পুরনো
বদভ্যাসগুলো এখনও একইরকম আছে না একটু কমেছে।
- সোনালীর বাবা আবার কিছুই
জানতে চায় না। আমি লক্ষ্য করে দেখেছি, কোন
কোন দিন রাতে ঘরের আলো জ্বালিয়ে ঘুমন্ত মেয়ের দিকে এক দৃষ্টে চেয়ে থাকে। বুক ফাঁকা
করে শ্বাস ফেলে। আমি যদি জানতে চাই, কী
হল? ঘাড় নেড়ে বলে, কিছু না।
- ওই যে বললেন না, পেটে ধরার যন্ত্রণা। প্রিয়মের বাবাকে যদি বলি, গার্জেন কল করলে, একবার
তো আমার সঙ্গে যেতে পারো। নির্বিকার মুখ করে বলে, ব্যবসার
ক্ষতি করে কী করে যাই বলো তো? টাকা
পয়সার জোগান কমে গেলে, সে
জায়গাটা তো আর তুমি কমপেনসেট করতে পারবে না। টাকা পয়সাই সব হল ! ছেলেটা যেমন আমার
তেমনি তোমারও তো।
- সোনালীর বাবা আবার মাঝে
মাঝে এমন অস্বস্তিতে ফেলে দেয় না ! ছুটির দিনে পাড়ার কেউ হয়ত এসেছে বাড়িতে। কোথাও
কিছু নেই, দুম করে
তার সামনে বলে বসল, সোনালীর
হাতে বোনা দড়ির পাপোশটা দেখাও না। বা সোনালীকে একবার ডাক। স্কুলে নতুন যে গানটা
শিখেছে, একবার গেয়ে শোনাক।
- ঠিক ঠিক।
এই একটা জায়গায় সব বাবাদের অদ্ভুত মিল। ছেলে মেয়ের স্কিল
কতটা বেড়েছে, হাঁকডাক
করে সেটা পাঁচজনের সামনে বড়াই করা। যেন কৃতিত্বের ভাগীদার কেবল উনি একাই।
ডিজগাস্টিং !
- যাই বলুন, এইরকম কিছু ঘটে যখন, আমার
কিন্তু বেশ ভালই লাগে। মনে হয়, কিছু
না হোক, মানুষটা তো তার সন্তানকে ভালবাসে।
হয়ত আমার মতো সব সময় লক্ষ্য রাখতে পারে না, কাছে
থাকতে পারে না। কিন্তু ভেতরে ভেতরে একটা টান তো আছে। আর আশ্চর্য ব্যাপার কী জানেন, মেয়েটাও কেমন পাল্টে যায় তখন! বাবা যা যা বলে, পারুক না পারুক, সেটা
করার চেষ্টা করে। আমি যেন নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারি না।
- আমার ছেলেটা আবার ঠিক উল্টো
রকম বিহেভ করে। জগদ্দল পাথরের মতো গোঁজ হয়ে বসে থাকে। মাঝে মাঝে মাথা তুলে ভাঁটার
মতো চোখ করে এমন তাকায়, ওর বাবা
ভয় পেয়ে কিনা জানি না, নিজেই
থেমে যায়। পারলে জায়গাটা ছেড়ে টুক করে ঢুকে যায় কোন একটা ঘরে। আমার তখন মনে মনে
খুব হাসি পায়। হুঁ হুঁ বাবা, এফারট
জিরো প্রফিট ফুল, তা তো হয়
না। আর বিশ্বাস করুন, তার পরে
পরেই আমি ছেলেকে ডাকি। সে বাধ্য ছেলের মতো উঠে দাঁড়ায়। যা যা করতে বলি, ঠিক ঠিক করে।
- আমার মা বলত, একেই নাকি নাড়ির টান বলে। মা মারা গেছে পাঁচ বছর হল। আমাকে
প্রায়ই বলত, কোন
চিন্তা করিস না। ছোটখাটো গরমিলগুলো, বড়
হলে সব ঠিক হয়ে যাবে।
- ঠিক বলেছেন। আমাদের মায়েরা
বুঝি একই রকমের হয়। আমার মা বলে, পেটে
ধরার কষ্ট যখন সইতে পেরেছিস, বাকিটুকুও
পারবি। এক মিনিট। মাইকে কী যেন বলছে না ?
- হ্যাঁ। বলছে এখনি পঞ্চাশ
মিটার দৌড় শুরু হবে। তারপরেই বল ছোঁড়া।
- আপনার মেয়েকে ডাকুন। ও
পার্টসিপেট করবে তো ?
- হ্যাঁ। প্রিয়মকে ডাকুন।
(দুই)
- অনন্যা ? অনন্যা ? আপনি
এটা কী করলেন ? ট্রাকের
মধ্যে ঢুকে মেয়েকে ঠেলে এগিয়ে দিলেন ?
- মোটেও না। ও যাতে বে-লাইন
হয়ে না যায়, সেইজন্য
ওর পিঠে হাত ঠেকিয়েছিলাম। ঠেলিনি মোটেও।
- মিথ্যে কথা বলছেন। আমি
স্পষ্ট দেখেছি সোনালীকে ঠেলতে ঠেলতে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। স্যারেরাও এটা দেখেছেন।
এইভাবে প্রাইজ উইন করাটা আনএথিক্যাল।
- ঠিক আছে ব্যাপারটা তো মিটে
গেছে। অন্যায় হলে সেটা স্যারেরা দেখবেন। আপনি নন।
- শুধু আমি নই। অনেকেই আপনার
কাণ্ডটা দেখেছেন। হাসাহাসি করছেন।
- সেটা আমাকে নিয়ে নয়। আপনাকে
নিয়ে। আপনি যা করলেন....।
- এটা আপনি আউট অফ জেলাসি
বলছেন। বল ছোঁড়ায় প্রিয়ম ফার্স্ট হয়েছে, এটা
মেনে নিতে পারছেন না। সোনালী তো বল হাতে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল।
- সোনালীর ব্যাপারটা আমায়
বুঝতে দিন। আপনি বরং প্রিয়মের হয়ে প্রাইজটা নিজে নিন। যেভাবে ওর হাত ধরে বলটা
নিজেই ছুঁড়ে দিলেন ....! ব্যাপারটা শুধু দেখতেই খারাপ নয়, ঘোর অন্যায়।
- আপনার উত্তরটাই দিই। সেটা
স্যারেরা বুঝবেন।
- গায়ে পড়ে ঝগড়া করাটা খুব
খারাপ।
- ভাইস ভার্সা। বুঝলেন না তো ? মানে আপনার সম্পর্কে আমারও একই কথা।
- গাড়ি চড়ে ঘুরে বেড়ালেই হয়
না। আচার ব্যবহারটাও ভাল হওয়া দরকার।
- সেটা আপনার থেকে শিখব না।
আপনি আমি সেম ক্যাটাগরিতে বিলংগ করি না।
- সে যাই হোক না। আপনার ছেলে
আমার মেয়ে একই স্কুলে পড়ে তো ? দুজনেই
মানসিকভাবে ডিসএবেলড এটা মানেন তো ?
- তাতে কী হল ? প্রিয়ম আর সোনালী এক হয়ে গেল ?
- কিছুটাও হল বৈকি। সোনালী
প্রাইজ ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল। প্রিয়মকে দেখুন, প্রাইজ
নিতে উঠে দাঁড়াতেই চাইছে না।
- কই ? কই ? হ্যাঁ তাই
তো ! এখন কী করি বলুন তো ?
- আপনি দাঁড়ান। আমি দেখছি।
আমি তো ওর অচেনা, আমার কথা
শুনতেও পারে।
- কী আশ্চর্য অনন্যা ! আপনার
কথা শুনে প্রিয়ম কেমন সুন্দর শান্ত ছেলের মতো উঠে দাঁড়াল। আবার ভিক্টরি স্ট্যান্ডে
প্রাইজ হাতে কেমন সুন্দর পোজ নিয়ে দাঁড়িয়েছে দেখুন। প্লীজ, আপনি ওর পাশ থেকে সরবেন না। প্রাইজ হাতে প্রিয়মের একটা ছবি
নিই।
- আপনার নিজের ক্যামেরা বুঝি?
- হ্যাঁ। সঙ্গে এনেছি।
মেমারেবল মোমেন্টগুলো বন্দী করে রাখতে হবে না ?
- জানতাম না তো, আপনার সঙ্গে ক্যামেরা আছে। তাহলে সোনালীরও ...!
- নো ম্যাটার। এই যে ভাই, কাইন্ডলি একটা উপকার করবেন ? আমরা
দুই মা আর বাচ্চারা দাঁড়াচ্ছি। একটা গ্রুপ ছবি তুলে দেবেন ?
- আমি প্রিয়মের হাত ধরে
দাঁড়াই। আপনি সোনালীকে পাশে নিয়ে দাঁড়ান। তাতে ওদের মনের জোর, সাহস দুই-ই বাড়বে।
- অ্যাবসলিউটলি কারেক্ট
অনন্যা। এটা একটা থেরাপিও বটে।
- অতশত বুঝি না। মনে হল, তাই বললাম।
- মনে হলেও অনেকে সেটা মুখে
প্রকাশ করে না। কে কীভাবে নেবে এই ভেবে। আমার অবশ্য তেমন কোন প্রবলেম নেই। অনন্যা ? আপনি বাড়ি ফিরবেন কখন ?
- এখনি। মেয়েটাকে ভাত খাইয়ে
আনিনি। এক পেট খেয়ে যদি দৌড়তে না পারে।
- প্রিয়মও ব্রেকফাস্ট খেয়ে
বেরিয়েছে। হাঁটাহাঁটি দৌড়োদৌড়িতে এতক্ষণে সেসব হজমও হয়ে গেছে। আপনি ফিরবেন কিসে ?
- দেখি। অটো টোটো কিছু পাই
কিনা। তোলা-ফটকের মুখ অব্ধি পৌঁছে গেলে, সেখান
থেকে তো কয়েক পা। হেঁটেই চলে যাব।
- অসুবিধা না থাকলে, আমার সঙ্গেও যেতে পারেন। তোলা-ফটকে নামিয়ে দিয়ে, আমি ইঞ্জিনিয়ার বাগান চলে যাব।
- বলছেন ?
- বলছি।
- আমরা দুজন মা না হয় পিছনের
সিটে বসি। সোনালী প্রিয়মের সঙ্গে সামনে বসুক।
- মন্দ বলেননি। এতে ওদের
দুজনের মধ্যে একটা বন্ডিংও তৈরি হবে। একি! আপনি হাসছেন কেন অনন্যা ?
- দেখুন ! দুজনে হাত ধরে কেমন
কেষ্টবিষ্টুর মতো হাঁটছে।
- ম্-ম্-ম্। চুপ চুপ। লীভ
দেম অ্যালোন। গেট পর্যন্ত দুজনকে হাঁটতে দিন।
- ঠিক বলেছেন বিপাশা। আসুন, আমরা বরং একটু আস্তে হাঁটি।
লেখকের অন্যান্য লেখা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।
লেখক পরিচিতি –
লেখালিখির শুরু গত শতকের শেষ দশকে। বাণিজ্যিক পত্রিকার পাশাপাশি লিটল ম্যাগাজিনে
লেখা প্রকাশের ক্ষেত্রে আগ্রহ বেশি। গল্প সংকলন আটটি এবং তিনটি উপন্যাস।
.jpg)