রমেশ বাবুর দুই কন্যা,শ্যামা আর রমা।
শ্যামার রঙ একটু চাপা,আর রমা একটু উজ্জ্বল। লোকে বলে,শ্যামা পেয়েছে বাবার রঙ আর রমা মায়ের। রমেশ বাবুর ছোট মুদিখানার দোকান,গড়পড়তা বিক্রি। দুই মেয়েই সরকারি বিদ্যালয়ে পড়েছে। তাই সাইকেল,ব্যাগ,জুতো স্কুল থেকেই পেয়েছে। স্কুলের বেতনও
নামমাত্র। ফলে পড়াশোনার খরচ বলতে দুই মেয়ের দুইজন করে চারজন গৃহশিক্ষকের মাহিনা,যা সব মিলিয়ে এক হাজার টাকা। তবে স্ত্রীর শরীর কদিন ধরেই ভালো যাচ্ছিল
না। জ্বর কমছে না। একদিন স্ত্রীর গায়ে হাত দিয়ে বললেন, 'তোমার গা তো আগুনে পুড়ে যাচ্ছে! ওষুধ খেয়েছ?'
'হ্যাঁ,একটা প্যারাসিটামল খেয়েছি।'
'না,আজই তোমাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবো।'
বিকালে পাড়ার অমিত ডাক্তারের কাছে গেলে,ডাক্তার বাবু
জিজ্ঞাসা করলেন,' জ্বরের সাথে কি বমি-বমি ভাব,গা-হাত-পা ব্যথা আছে?'
মাথা নাড়ে প্রতিমা।
অমিত ডাক্তার কতকগুলি পরীক্ষা করতে দেন। দুদিন পর
রিপোর্ট পেয়ে জানা গেল ডেঙ্গি হয়েছে। বাড়িতে ক্রমশঃ দুর্বল হয়ে পড়ছিল
প্রতিমা। রিপোর্ট পেয়ে রমেশ বাবুকে হাসপাতালে যাওয়ার পরামর্শ দিলেন অমিত
ডাক্তার। হাসপাতালে অনেক কষ্টে একটা বেড পাওয়া গেল বটে,তবে স্যালাইন
চালাতে হল সাথে সাথে। হঠাৎ করেই বজ্রপাতের মত একদিন ভোরবেলায় প্রতিমার মারা
যাওয়ার খবর এল রমেশ বাবুর কাছে।
অকূল-পাথারে পড়লেন রমেশ বাবু। দুই মেয়েকে বড় করা,ঘরের কাজ,দোকান সামলানো ও সংসারের হাজারো কাজ কীভাবে সামলাবেন,ভেবে পান না রমেশবাবু। শ্যামা বলল,'বাবা ,যা হওয়ার তা-তো হয়েই গেছে,মা তো আর ফিরে আসবে না,আমিই দায়িত্ব নিচ্ছি ঘরের কাজের।'রমেশ বাবু বললেন,'সে তো নিবি,নিতে হবেও। কিন্তু তোদের পড়াশোনা আছে,সেটা না ক্ষতি হয়ে যায়!'
শ্যামা বলে,'তুমি চিন্তা করো না। আমি রান্নার কাজ
সকালেই করে নেবো। স্কুল থেকে এসে রাতের
রান্নাটাও করে দেব'খন।'কাছেই দাঁড়িয়ে
ছিল রমা। সে বলল,'বাকি কাজটা আমি করে দেবো,বাবা।'
দেখতে দেখতে সাতটা বছর কেটে যায়। শ্যামার বিয়ে হয়েছে
দেখাশোনা করেই। আর আজ রমার পাকা দেখার দিন। রমা বর্তমানে একটি কলেজে পার্ট-টাইম
পড়ানোর কাজ পেয়েছে। সাথে অন্যান্য পরীক্ষার প্রস্তুতিও নিচ্ছে। বাড়িতে আজ অনেক
আত্মীয়-স্বজন। সবাই হাসি-খুশি,মজায় মেতেছে।
রমেশ বাবু আজ আরও একা। প্রতিমাকে আজ খুব মনে পড়ছে। ও
থাকলে আনন্দটা আজ ভাগ করে নেওয়া যেত,নিঃসঙ্গতার যন্ত্রণাটা এতটা ভারি হয়ে
উঠত না।
লেখকের অন্যান্য লেখা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।
লেখক পরিচিতি –
কর্মজীবন শুরু নতুন দিল্লীতে, ২০০০ সালে। তারপর ২০১৪ থেকে চারবছর দিল্লীতে অবস্থান। মাঝে কোলকাতা,গুয়াহাটির পর ২০২৪ -এর ডিসেম্বর থেকে আবার দিল্লীতে। বর্তমানে কেন্দ্রীয় সরকারের একটি অফিসে আধিকারিক পদে কর্মরত। লেখালেখি করা নেশা। ছোট-বড় পত্রিকায় লেখা প্রকাশ হয় মাঝেমধ্যে। আকাশবাণীর বিভিন্ন সাহিত্য অনুষ্ঠানে লেখা পঠিত হয়েছে। একটি বিজ্ঞান ক্লাবের সাথে যুক্ত এবং পরিবেশ বিষয়ক বিভিন্ন গণ আন্দোলনের সাথে যুক্ত আছেন।
.jpg)