Advt

Advt

birbhumer-hetampurer-raj-paribar-o-shesh-ranimaa-feature-probondho-by-arijit-hazra-tatkhanik-digital-bengali-web-bangla-online-e-magazine-অরিজিৎ-হাজরা

birbhumer-hetampurer-raj-paribar-o-shesh-ranimaa-feature-probondho-by-arijit-hazra-tatkhanik-digital-bengali-web-bangla-online-e-magazine-অরিজিৎ-হাজরা

রাঙ্গামাটির দেশ এই বীরভূম। আধ্যাত্মিকতা, সাহিত্য সংস্কৃতির পাশাপাশি বীরভূমের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে রয়েছে বহু অজানা ইতিহাস । অবহেলায় পড়ে থাকা সেই সব ইতিহাস বর্তমানে ম্লান হতে বসেছে সময়ের নিয়মে। ঠিক একইভাবে ম্লান হতে বসেছে বীরভূমের হেতমপুরের জমিদার বংশের কথা।

বীরভূমের  ইতিহাস ঘাটলে জানা যায় যে বীরভূমের এই হেতমপুর একসময় ছিল  সেনাপতি হাতেম খায়ের দুর্গস্থল। তার নাম অনুসারে এই স্থানের নাম হয় হেতমপুর। তবে  নামকরণ নিয়ে বিতর্ক আছে । হেতম খায়ের পালিত কন্যা সেরিনা বিবি মোগল সৈন্যদলদের বিরুদ্ধে লড়াই করে হেতমপুরের এই দুর্গ রক্ষা করেছিলেন। পরবর্তীকালে রাজনগরের পাঠান রাজার নায়েব এর কাছ থেকে জমিদারির দায়িত্ব গ্রহণ করেন রাজ চক্রবর্তী বংশ। আর এখান থেকেই উত্থান হয় হেতমপুরের চক্রবর্তী জমিদারি বংশের। হেতমপুর রাজবাড়ী নির্মিত হয় মুর্শিদাবাদের হাজারদুয়ারির অনুকরণে। তবে এই রাজবাড়িটিতে ৯৯৯ টি দরজার স্থাপত্য রয়েছে। তার কারণ হিসেবে জানা যায় যে মুর্শিদাবাদে হাজারদুয়ারির সম্মানের জন্য একটি দরজা এখানে কম নির্মাণ করা হয়েছিল এখানে।

এই হেতমপুরে রাজ পরিবারের বহু রাজাদের মধ্যে রাজা অনাদি চক্রবর্তী-র নাম স্বর্ণাক্ষরে লিখিত রয়েছে বীরভূমের জমিদারি বংশের ইতিহাসে। অনাদি চক্রবর্তী সত্তর এর দশকে কলকাতার অভিনয় জগতে বেশ সুনাম অর্জন করেছিলেন। এই পরিবারের শেষ রাজা ছিলেন মাধবী রঞ্জন চক্রবর্তী। বীরভূম জেলার শিক্ষা ক্ষেত্রে থেকে ও সংস্কৃতি ক্ষেত্রে মাধবী রঞ্জন বাবুর অবদান অনস্বীকার্য। কলেজ নির্মাণ,স্কুল নির্মাণ  বিশেষ করে মেয়েদের স্কুল নির্মাণ থেকে শুরু করে বীরভূম সাহিত্য পরিষদের উন্নয়ন জেলা গ্রন্থাগার  থেকে বহু উন্নয়নে এবং বীরভূম জেলার বহু স্থাপত্য কীর্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে মাধবী রঞ্জন বাবুর অবদান এবং ভূমিকা উল্লেখযোগ্য ও চিরস্মরণীয় ।

আর পাঁচটা জমিদার বংশের থেকে বীরভূমের হেতমপুরের চক্রবর্তী রাজ পরিবার ছিল সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী । সম্প্রতি এই রাজ পরিবারের শেষ রানীমা  পূর্ণিমা চক্রবর্তী ও চলে গেলেন না ফেরার দেশে।  সকলের কাছে রানীমা হিসাবেই পরিচিত ছিলেন পূর্ণিমা দেবী। তিনি ছিলেন রাজ পরিবারের শেষ রাজা মাধবী রঞ্জন চক্রবর্তীর সহধর্মিনী। বার্ধক্য জনিত সমস্যায় ভুগছিলেন দীর্ঘদিন ধরেই।  রেখে গেলেন মানুষের জন্য বহু জনহিতকর বহু কাজের সাথে সাথে সম্প্রীতি ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ।

এই পরিবারের শেষ রানীমা, পূর্ণিমা দেবী  কর্মজীবনের শেষ দিন পর্যন্ত বিভিন্ন সামাজিক কাজে যুক্ত ছিলেন সকলের অন্তরালে। বিশেষ করে সরস্বতী পুজোকে কেন্দ্র করে সাহিত্য সভার আয়োজন করতেন প্রতিবছর। বীরভূমসহ বাংলার বিভিন্ন প্রান্তের বহু গুণীজনরা এই সাহিত্য সভায় উপস্থিত হতেন। তবে তার শারীরিক সমস্যার পর থেকে রানীমার কন্যা বৈশাখী চক্রবর্তী এই সাহিত্য সভাকে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন পারিবারিক ঐতিহ্যকে সঙ্গে নিয়ে ।

হেতমপুর রাজ পরিবারের শেষ রাজা মাধবী রঞ্জন চক্রবর্তী এবং রানীমা পূর্ণিমা চক্রবর্তীর কন্যা রাজকন্যা বৈশাখী চক্রবর্তীর এক কাছের বন্ধু রিনা কবিরাজের কাছ থেকে জানা গেল যে শেষ রানীমা বহুদিন ধরে বহু শারীরিক সমস্যার মধ্যে ছিলেন এবং শেষের দিকে দেহের বেশি বেশিরভাগ অংশই পঙ্গু হয়ে যায়। কথাবার্তাও ঠিকঠাক বলতে পারতেন না। বিবাহিত জীবনের প্রথম দিকে বেশিরভাগ সময় কলকাতা থাকতেন তিনি। স্বামী মাধবী রঞ্জন চক্রবর্তী মারা যাবার পর দুই কন্যাকে নিয়ে চলে আসেন বীরভূমের হেতমপুরে এবং শেষ দিন পর্যন্ত এখানেই ছিলেন । এছাড়া জীবনের বেশিরভাগ সময়েই একজন সাধারন গৃহবধূ হিসাবে এই জীবন কাটিয়ে গেছেন তিনি। মাধবী রঞ্জন বাবু কলকাতায় থাকাকালীন বহু অর্থ খরচ করেছিলেন বেহিসাবী ভাবে। এর ফলে তাদের আর্থিক কষ্টের অবস্থা সৃষ্টি হয়। এছাড়া হেতমপুরের বহু জমি জায়গা নিয়েও বহুদিন ধরে বহু লড়াই করেছিলেন রানীমা। এখন রানীমার কন্যা বৈশাখী চক্রবর্তী সেই সব সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করছেন বিভিন্ন উপায়ে।

হেতমপুর রাজ পরিবারের সেই আভিজাত্য এখন আর হয়তো নাই তবে পারিবারিক সংস্কার সংস্কৃতিতে এবং অঞ্চলে মানুষের কাছে তারা এখনো সে জমিদার পরিবারের অংশ হিসেবেই গণ্য হতেন। রানীমা পূর্ণিমা দেবী ও পরবর্তী সময়ের সাথে মানিয়ে নিয়ে জীবন কাটিয়েছেন অতি সহজ সরল ভাবে। তবে যতদিন তিনি শারীরিকভাবে সুস্থ ছিলেন সমাজের জন্য এবং সাহিত্য সভার জন্য সকলকে উৎসাহ দিতেন আন্তরিকভাবে।

বীরভূমের হেতমপুর-এর রাজপরিবারের শেষ রানীমা পূর্ণিমা চক্রবর্তীর মৃত্যু সঙ্গে সঙ্গে শেষ হলো বীরভূমের একটি রাজ পরিবারের যুগের। তবে এই রাজ পরিবারের বহু কাহিনী এখনো বয়ে চলেছে সময়ের ইতিহাসের প্রবাহে। ইতিহাসের পাতায় যেমন স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে বীরভূমের হেতমপুর রাজপরিবারের কথা এবং সেই সাথে সাথে লেখা থাকবে শেষ রানীমা পূর্ণিমা চক্রবর্তী নাম।।

লেখক পরিচিতি -

অরিজিৎ হাজরা,পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার সদর শহর সিউড়িতে বসবাস করেন ।  দীর্ঘ ২১ বছর ধরে শিক্ষকতার কাজে নিয়োজিত।  নেশা হচ্ছে লেখালেখি এবং তথ্যের অনুসন্ধান করা। একজন প্রাবন্ধিক গল্পকার হিসেবেই বেশি পরিচিত ।