Advt

Advt

niruddesh-story-galpo-by-prasanta-das-tatkhanik-digital-bengali-web-bangla-online-e-magazine-নিরুদ্দেশ-গল্প-প্রশান্ত-দাস


niruddesh-story-galpo-by-prasanta-das-tatkhanik-digital-bengali-web-bangla-online-e-magazine-নিরুদ্দেশ-গল্প-প্রশান্ত-দাস

গ্রামে ফিসফাস শুরু হয়েছে। 'এসেছে রে এসেছে।' 'তুই দেখেছিস নাকি!'  'দেখিনি, তবে ভালো লোকের থেকেই শুনেছি। উনি নাকি স্বচক্ষে দেখেছেন।' 'শুনলাম আগের সেই গোলগাল চেহারাটা আর নেই, অনেক রোগা হয়ে গেছে।'

কমলেশ কলেজে পড়তে পড়তেই উধাও হয়ে গিয়েছিল। প্রথম দিকে পাড়া-প্রতিবেশীরা খোঁজ -খবর করলেও সময়ের গতিতে সেই উৎসাহে ভাঁটা পড়েছিল। দুই মেয়ের পরে ছেলে, ফলে একটু বেশিই আদর-যত্ন  পেয়েছিল কমলেশ। পড়াশোনায় খুব যে আহামরি ছিল তা বলা যাবে না,তবে একটা কেরানির চাকরি যে জুটে যাবে  সেটা পরিজনেরা বিশ্বাস করতো। সেই কমলেশ হঠাৎ করেই কোথায় চলে গেল। ছেলে ফিরে আসবে - এই প্রত্যাশায় থেকে থেকে বাবা,মা দুজনেই গত হয়েছেন। বোনেদের বিবাহ হয়ে গেলেও তাঁরা পৈতৃক বাড়িটি রেখে দিয়েছেন। একজন কাজের মহিলা রাখা আছে যিনি সকাল-সন্ধ্যায় ঘরদোর পরিষ্কার ও পূজা করে দিয়ে যান।

 'কালই তো দেখলাম কমলেশ বাড়ি থেকে বেরোচ্ছে। একগাল দাড়ি।পাজামা-পাঞ্জাবি পরেছে,পায়ে হাওয়াই চপ্পল। তবে দেখে মনে হল সেই গোলগাল চেহারাটা আর নেই,বেশ মেদ ঝরেছে।'এক প্রতিবেশী বলে।

'আরে চুপি চুপি শোন। ওপাড়ার গোপাল ঠাকুরপো বলছিল,ও নাকি লুকিয়ে লুকিয়ে একবার করে মালবিকার কাছে যায়। গোপাল ঠাকুরপো নাকি দেখেছে !'আর এক প্রতিবেশী বলে। 'তবে এতদিন কোথায় ছিল কে জানে। তবে অনেকে বলছে দেখি ও নাকি স্বদেশী করে। ওর সম্বন্ধে তাই বেশি কথা না বলাই ভালো। পুলিশি হুজ্জুতি হতে পারে।' -তৃতীয় প্রতিবেশী বলে।

......................................................................................................................

'মালবিকা কেমন আছ?'

' কে কমলেশ ?'

'হ্যাঁ,চিনতে পারলে এত সহজে! কুড়িটা বছর তো কম সময় নয়!'

 'সময় যতই যাক,যে স্বর মনে রয়ে যায়,তাকে কি ভোলা যায়? সে যে অহরহ মনে করিয়েই চলে।'

'মালবিকা,তোমার শরীর ভালো নেই জেনেছি।'

মালবিকা হাসে। 'যে রোগ আমাকে ধরেছে তার থেকে নিস্তার নেই। সে আমাকে নিয়ে যাবে বলেই ঠিক করেছে। কিছু তো খাওনি। একটু বসো। জলখাবারটা খেয়ে যাও,আর দুপুরের খাবারটা নিয়ে যেও।'

'মালবিকা,তুমি তো বিবাহ করে সংসার করতে পারতে? স্বামী-সন্তান সুখ পেতে পারতে?'

'কমলেশ,সম্বন্ধ আমার বেশ কয়েকটা এসেছিল;তবে আমিই না করে দিয়েছি। মনে হয়েছিল, যাকে বিয়ে করবো,তার প্রতি  প্রতারণা করা হবে। বললেই তো কাউকে ভালোবাসা যায় না।'

'মালবিকা,কলেজে পড়তে পড়তেই কয়েকজন বন্ধু নিয়ে গেল কয়েকটি আদিবাসী গ্রামে। দেখলাম তাঁদের অবর্ণনীয় দারিদ্র্য,লাঞ্ছনা,অপমান প্রতিদিনের জীবনে। যারা আমাদের ভূমিপুত্র, যাদের কাছ থেকে আমরা নগর পরিকল্পনা,সভ্যতা শিখেছি,তাঁরা কেন এমন অবস্থায় থাকবে! দেশের মূল স্রোতের সাথে এনাদের যুক্ত করা দরকার। প্রকৃতি,পরিবেশ রক্ষার বিষয়ে অনেক কিছু শেখারও আছে এনাদের থেকে। এরা এভাবে থাকলে দেশেরই ভবিষ্যতের ক্ষতি। তাই মনে হল, আমি আমার বাকি জীবনে এদের জন্য যদি কিছু করতে পারি, তাহলেই আমার এই মানব জীবন সার্থক বলে মনে করবো।'

'কমলেশ,তুমি চলে যাওয়ার পরপরই তোমাকে খোঁজার চেষ্টা করে গেছি। অবশেষে তোমার খবর পাই একজন স্বদেশীর কাছ থেকে। আমি ইচ্ছা করেই তোমাকে ডাকিনী। মনে হয়েছে, যে বাঁধন ছিন্ন করেছে,তাকে জোর করে বাঁধবার চেষ্টা করলে,সে আর স্বাভাবিক থাকে না। আমি তোমাকে মুক্ত,স্বাধীন হিসেবেই দেখতে চেয়েছি।'

জলখাবার খেতে খেতে কমলেশ বলে,'আর বেশিদিন এখানে থাকা ঠিক হবে না। ব্রিটিশের পুলিশ গ্রামে আসবে। আমার জন্য গ্রামের লোকেরা বিড়ম্বনায় পড়ুক,তা আমি চাই না।'

'একটু বসো ', বলে মালবিকা রান্না ঘরে যায়। একটু পরে টিফিন বক্সে খাবার নিয়ে এসে কমলেশের হাতে দেয়।

 'আমি যাই তবে।'

 'না,আর একটা কাজ বাকি আছে।'

'বলো ,কী করতে হবে।'

 মালবিকা একটা সিঁদুরের কৌটো খুলে বলে,'নাও,এখান থেকে সিঁদুর নিয়ে আমার সিঁথিতে পরিয়ে দাও।'

'কিন্তু তুমি তো জানো, এসব আচারে আমার বিশ্বাস নেই।'

'তোমার নেই, কিন্তু আমার আছে।'

কমলেশ কৌটো  থেকে সিঁদুর নিয়ে মালবিকার সিঁথিতে টেনে দেয়। এরপর বেরিয়ে আসে কমলেশ।

 গ্রামে পুলিশের আনাগোনা শুরু হয়েছে। নানাজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে তারা। ওদিকে চৌধুরী বাড়ির মেয়েটিও সঙ্কটাপন্ন। চল্লিশ না পেরোতেই  মারণ ক্যানসার তাকে নিয়ে নিল। তাঁর শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী কপালে বড় করে সিঁদুর লাগিয়ে তাঁকে  অন্তিম যাত্রায় নিয়ে যাওয়া হল। সেদিন থেকে কমলেশকেও আর দেখা গেল না। ধূমকেতুর মত আবির্ভূত ছেলেটি যেন ধূমকেতুর মতই নিরুদ্দেশ হয়ে গেল। গ্রামের সেই খালি বাড়িতে তারপরও প্রতিদিন  সন্ধ্যায় প্রদীপ জ্বলেছে, শাঁখ  বেজেছে।

লেখকের অন্যান্য লেখা পড়তে এখানে ক্লিক করুন ।

লেখক পরিচিতি –

লেখালেখির শখ ছোটবেলা থেকেই। কর্মসূত্রে সাড়ে ছয় বছর দিল্লীতে থাকার পর ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাস থেকে আবার দিল্লীতে অবস্থান। কেন্দ্রীয় সরকারের একটি অফিসে আধিকারিক পদে কর্মরত। অন্যান্য কাজের পর মানসিক আনন্দ পেতেই বই পড়া ও লেখালেখির চর্চা। ছোটবড় বিভিন্ন পত্রিকায় লেখা লিখে থাকেন।আকাশবাণীতে সাহিত্যের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে লেখা পঠিত হয়েছে। বিশেষ আগ্রহ- পরিবেশ, বিজ্ঞান মনস্কতার প্রসার এবং সামাজিক সম্পর্ক ।