ধারাবাহিক গল্প
৩য় ও শেষ পর্ব
(৪)
গোবিন্দজীর
মন্দির প্রায় শেষ হয়ে এসেছে । চূড়োটার সোনালী রঙ চলছে । ওইটুকু হয়ে গেলেই হবে
উদ্বোধনের অনুষ্ঠান । বিগ্রহ প্লাস্টিক দিয়ে ঢাকা । লতিকা ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগল ।
মন্দিরটা ছোট নয় । সামনে বড় একটা দালান আছে । হয়ত নামগানের উদ্দেশ্যে রাখা হয়েছে ।
তার চারদিকে মাঠ আর ফুলগাছ । কন্ঠিপরা , কপালে চন্দন লেপা, কয়েকজন ভক্ত ঘোরাঘুরি করছে । তারা সবাই লতিকার দিকে অবাক
চোখে তাকাচ্ছে । আগে কখন দেখেনি তাই জন্যেই হবে । তাছাড়া নীল চুড়িদার , শাদা ওড়না পরা লতিকা তাদের কাছে
বেমানান মনে হতেই পারে ।
সুব্রত
বাগ মিস্ত্রিদের তদারকি করছিলেন । লতিকা দালানে এসে দাঁড়িয়েছে দেখে ফের এগিয়ে এলেন
।
- একবার যে দেখিয়ে দিলাম, এবার আর পথ চিনতে অসুবিধা হবে না
তো মা ।
যেন আবার
আসার জন্যে লতিকা বদ্ধপরিকর । এই একটা আশ্চর্য স্বভাব ভদ্রলোকের আছে । তিনি যা
চাইছেন , তার বাইরে
অন্য কোন লিপ্সা যে থাকতে পারে, তা তিনি সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে যান। লতিকা উত্তর দিল ,
- না । রিক্সায় বেশ আসতে
পারব । সেই বাছুরটা কোথায় ?
- এদিক ওদিক গেছে হয়ত ।
তাকে তো আমরা বেঁধে রাখিনা । পরের দিন হয়ত দেখতে পাবেন ।
পরদিন যায়
। তারও পরদিন । লতিকা বাছুরের খোঁজে খোঁজে মন্দিরে যায় । অভিভাবকহীন বাছুরটা তো বড়
দুষ্টু হয়ে গিয়েছে । রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ায় ।
প্রতিদিন
ফ্ল্যাটে ফেরার পর শর্মিলা খোঁজ নিতে আসে । তোমার কি এটা নতুন শখ হয়েছে লতিকা? রোজ রিক্সা ভাড়া করে বাছুরের খোঁজে
যাচ্ছ। এলাকাতে কি বাছুরের অভাব ? লতিকা বলে আপনি কেমন আছেন ? নীলাঞ্জনের মেইন্টেনেন্সের টাকা আসতে দেরী হচ্ছিল , খুব ধ্যাতানি দিয়েছি । বাই দি ওয়ে
জান , ইয়ং
ছেলেরা খুব ভাল বয়ফ্রেন্ড হয় । ওদের চোখে কত ড্রিম , কত ফ্যান্টাসি থাকে । একটি ছেলের
সঙ্গে ডেট করছি । তোমার বরের যা নাম , ওরও তাই নাম , অরিন্দম .... তবে ডেট পর্যন্তই ভাল , তার বেশী আর এগোব না ... ... আমরা
দুজন যে আলাদা আলাদা একা থাকি , কোন ব্যাগেজ নেই , একদম ইন্ডিপেন্ডেন্ট এক্সিস্টেন্স এর চেয়ে ভাল আর কি হতে
পারে ? ঘরে একটা
পুরুষমানুষ থাকলে একেবারে নাস্তানাবুদ করে রেখে দেবে । আমি একটা ভাল জব করি, আমার রোজগারের টাকায় আমি ইচ্ছে মত
থাকব , ইচ্ছেমত
আনন্দ করব । একটা স্বামী পুষব কেন ?
মন্দিরের কাজ শেষ । বিগ্রহ উন্মোচিত করলেন
মন্দিরের সেক্রেটারি মোহন গোস্বামী ।
বাঁশরি বাদনরত ভগবান গোবিন্দ । পাশে নির্মিমেষে চেয়ে আছেন রাধা । গোবিন্দর
হলুদ সিল্কের কাপড় , রাধার লাল । তার পাশে একটি বাছুর ।
সুব্রত
বাগ বললেন ,
- ওইখানে একটি বাছুর
রয়েছে । ও বড়ই অনাথ ।
- ও তো মাটির ।
- মাটিরও তো সেবা লাগে । তাই তো ওর যে সেবার দরকার । কারই বা মনে থাকবে বলুন? সবারই মন থাকবে গোবিন্দজীর দিকে । এত পশুপাখির সেবা করেন , ওই বা কি দোষ করল ?
(৫)
মোহন
গোস্বামী হৃষ্টচিত্তে বললেন ,
- মা,তুমি যে মন্দির তহবিলে দান করেছ,তা আমরা ডোনারদের তালিকায় লিখে
রাখব। মন্দিরের এন্ট্রেন্সে তা একটি পাথরের ফলকে শোভা পাবে । পরশু উদ্বোধনী
অনুষ্ঠান । তোমায় আসতেই হবে মা ।
উদ্বোধনী
অনুষ্ঠানে সামিয়ানা করা হয়েছে । সাজানো হয়েছে লাল, নীল , হলুদ কাপড়ে । মাইক বাজছে । প্রথমে বক্তৃতা ও ভক্তিমূলক গান
হল । তার পর কাঙালিভোজন । দালানে পাত পেড়ে খাওয়ানো হবে । নিরামিষ খাওয়া । মোহন
গোস্বামী তদারকি করছেন । সেক্রেটারি বলছেন
,
- আস্তে,আস্তে । হুড়মুড় করে ঢুকবেন না ।
আগের জনকে আগে বসতে দিন ।
দলে দলে
মানুষ বসে খাওয়া শুরু করেছে । অনেকেই মজুর বা দিনভিখারী । এদের মধ্যে দুই শ্রেণী ।
কেউ বসেই হাপুস হুপুস করে খাওয়া সুরু করে দিচ্ছে । যেন এই যে খাচ্ছে , আবার একমাস খাবার খেতে পাবে না ।
আরেক দল আছে , তাদের মনস্তত্ত্ব বেশ জটিল । এরা কেবল ক্ষুধা আর লোভ সংবরণ
করে যাচ্ছে । ভাবটা এই , হাপুস হুপুস করে খেলে যদি নির্ধন ভাবে । কাঙালি হতে পারি , তা বলে কি হাঘরে নাকি , আমাদেরও আত্মসম্মান আছে !
স্টিলের
বালতি করে করে গরম ভাত আসছে । সুব্রত বাগ কোমরে গামছা জড়িয়ে নেমেছেন পরিবেশনে ।
শালপাতার থালায় ভাত দেওয়া হচ্ছে । ধোঁয়া ওঠা ভাত । দুতিনটি বড় পেডেস্টাল পাখা চলছে
বটে , কিন্তু
তেমন হাওয়া হচ্ছে না । ঘামতে ঘামতেই খাচ্ছে সবাই ।
- মা, একটু ডালটা এগিয়ে দাও তো ।
লতিকা না
বলতে পারল না । সে চুড়িদার পরেই ডাল এগিয়ে দিল , এগিয়ে দিল লাবড়ার তরকারি । চাটনির সময় হাতা আর বালতি হাতে
তাকে দেখা গেল পরিবেশন করতে । তারপর দৈ-এর সময় সুব্রত বাগ যখন বললেন ,
- এবার আমায় দাও মা ।
এক্কেবারে ঘেমে গেছ । যা গরম । পরিশ্রম অভ্যাস হতে তোমার সময় লাগবে ।
তখন
লতিকার চোখে অকারণেই জল এসে গেল । অথচ জল আসার মত কোন কথা বলা হয়নি। সে ভেবেছিল
ডাল বা তরকারি , উচ্ছিষ্ট কিছু যদি তার সাধের সারমেয়দের জন্য যদি পাওয়া যায়
। কিন্তু তা পাওয়া গেল না । মানুষের দাবীর তীব্রতা অনেক বেশী ।
(৬)
মন্দির
উদ্বোধনের মাসখানেক হয়ে গিয়েছে ।
দালানে
শতরঞ্চি পেতে কীর্তন চলছে । ভক্তসমাগম খারাপ হয়নি । সর্বোপরি বেশ কিছু গণ্যমান্য
ভক্ত এসেছেন । এর মধ্যে অনেকেই ট্রাস্টি বোর্ডের মেম্বার । মোহন গোস্বামী ব্যস্ত
হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন । বোঝা যাচ্ছে তিনি বেশ উত্তেজিত । টেনশনে রগটা দপ্ দপ্ করছে ।
এমনিতেই তাঁর প্রেশারের অসুখ, মাঝে মাঝেই ওষুধ খেতে ভুলে যান । আজ বিনা কারণে একে ওকে ধমক
দিচ্ছেন ।
সুব্রত
বাগ কীর্তনসভা থেকে বাইরের বাগানে এসেছেন । তিনি খোলা হাওয়ায় এসে মাঝে মাঝে তামাক
নেন । যদিও ডাইবিটিসের ডাক্তার কড়া ভাষায় তামাক খেতে বারণ করেছেন কিন্তু এই কাজটিই
তিনি বহুবার করে থাকেন । হার্ট অ্যাট্যাক সম্বন্ধে ডাক্তারের ভবিষ্যৎবাণী ভুল
প্রমাণ করার তাঁর অদম্য ইচ্ছে । ঠিক তখনি মোহন গোস্বামীও বাইরে এলেন ।
- সুব্রতবাবু ।
- বলুন
সেক্রেটারি-মহারাজ ।
- শুধু মহারাজ বললেই তো
হয় । সেক্রেটারি কথাটা সুখকর নয় মোটেই ।
- আচ্ছা শুধু মহারাজ ।
- রসিকতা করছেন । শুধু
কথাটা কী মহারাজকে খাটো করার জন্যে যোগ করলেন ।
- মহারাজ ।
- কি হচ্ছে বলুন তো ? স্বামী পরিত্যক্তা এক মহিলা-
- ভদ্রমহিলা।
- শেষ করতে দিন। উনি
কুকুর-বিড়াল নিয়ে কী শুরু করেছেন। পৃথিবীর সমস্ত রুগ্ন, অভাগা, অস্থিচর্মসার সারমেয় এই মন্দিরে
আনাগোনা শুরু করেছে । তারা যেখানে সেখানে দুষ্কর্ম করে রাখে। আজ ট্রাস্টি বোর্ডের
প্রেসিডেন্ট জাস্টিস দুলাল মুখোপাধ্যায় বলেই ফেললেন, এ সব কী হচ্ছে? মন্দির এত নোংরা কেন? আপনারা খেয়াল রাখেন না? শুধু কুকুর নয়, এখন রাস্তার ভিখারিরাও তাদের ঘা-দাদ নিয়ে এসে জুটছে।
- কী করব?
- লতিকা দেবীকে বলুন
অনেক হয়েছে । আমরা তো কাউকে জোর করে আসতে বলিনি।
- আমিই তাঁকে নিমন্ত্রণ
করে এনেছিলুম ।
- নিমন্ত্রণটা তবে
ফিরিয়ে নিন ।
- তিনি বড় দুঃখী ।
- নামগান করতে বলুন,সব দুঃখ চলে যাবে ।
- বলেছিলুম,তারপর দেখলুম নামগানের সময় তিনি
অন্যমনস্ক হয়ে থাকেন। ওই অনাথ গাভীটির দিকে চেয়ে থাকেন একদৃষ্টিতে। রুগ্ন কুকুর
বিড়ালের জন্য মন তার পড়ে থাকে ।
- তাঁকে চলে যেতে বলুন ।
সুব্রত
বাগ তামাকটি মাড়ির ফাঁকে রাখলেন । লম্বা একটি নিশ্বাস নিলেন । ঠিক তখনই মন্দিরের
গেটের কাছ থেকে , মাইক বাহিত নামগানের শব্দ ছাপিয়ে একটি কান্না ভেসে এল ।
ইনিয়ে বিনিয়ে আসছে সেই কান্নাটা। কুকুরের কান্নাই হবে। কিন্তু কী যন্ত্রণা ফুটে
বেরুচ্ছে তাতে । বোধহয় লতিকা কারুর ক্ষত ড্রেসিং করছেন । সুব্রত বাগের চোখের সামনে
ভেসে উঠল একটি গরমে ধুঁকতে থাকা সন্তানসম্ভবা মা কুকুর , তার পিছনের বাঁ পায়ে দগ দগে ঘা ...
অনেক কষ্টে বমিটা তিনি সংবরণ করলেন ... সেই ঘায়ে ওষুধ লাগাচ্ছেন লতিকা –
- না, মহারাজ পারব না। পারা সম্ভব নয় ।
- বেশ, আমিই যাচ্ছি তবে । বলতে তো কাউকে
হবেই । সবাই ভাল সেজে থাকলে তো আর ভগবান ক্ষমা করবেন না !
বলতে বলতে
নিজেই গেটের দিকে হন্ হন্ করে এগিয়ে গেলেন মোহন গোস্বামী। দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
অযোগ্যরা নিমন্ত্রিত হলে মন্দিরটাই যে অপবিত্র হয়ে যায়,চেষ্টা করেও সুব্রত বাগকে এই
সামান্য কথাটি এখনো বোঝাতে পারলেন না।
সমাপ্ত
লেখকের
অন্যান্য লেখা পড়তে এখানে ক্লিক করুন ।
লেখক পরিচিতি –
জন্ম ১৯৭৪ । পেশায় চিকিৎসক , এমডি , ডিএম ( কার্ডিওলজিস্ট ) ।কবি , সমালোচক , রবীন্দ্র অনুরাগী ও শনিবারের চিঠির সম্পাদক সজনীকান্ত দাসের পৌত্র ।
ছোটগল্প প্রকাশিত হয়েছে নবকল্লোল , শনিবারের চিঠি ( নবপর্যায় ), সুদক্ষীণা , গল্পপত্র , কাথাসাহিত্য , শারদীয়া দক্ষীণীবার্তা , কবিতা ও গল্প বারোমাস , কালপত্রী , ইছামতি বিদ্যধরী, অন্ধপক্ষ প্রভৃতি পত্রিকায় ও নানা লিটল ম্যাগাজিনে।
গল্পগ্রন্থ : সৈকত শিল্পী , বনবিহঙ্গ ।
উপন্যাস: সমান্তরাল ।

