ধারাবাহিক গল্প
২য় পর্ব
(২)
বেল
বাজানোর নিজস্বতা থাকে অনেকের । বাজানোর কায়দা শুনে বোঝা যায় কে । এখন যে বাজাচ্ছে
সে যে শর্মিলাদি তাতে কোন সন্দেহ নেই । লতিকা দরজা খুলল।
শর্মিলা পাল । শর্মিলা যে চল্লিশের কোঠায় তা বোঝা মুস্কিল । সে সব
সময় সাজগোজ করে থাকে । আজ যেমন কালো সিল্কের শাড়ি আর কালো ব্লাউজ পরে আছে । অথচ তাঁর কোথাও বেরুনোর নেই।
একটু চাপা হাসি হেসে বলল ,
- তিনি খবর দিয়েছেন ?
- কে ?
- অরিন্দমবাবু । তিনি আসছেন না এবছর ?
- এখনো আসবে কিনা ঠিক নেই । তবে টাকা পাঠাবে বলেছে ।
- কতদিন এভাবে পাঠাবেন এইটাই পরিস্কার নয় । বরং ডিভোর্স
চান , মেইনটেনেন্স চান । একটা আইনের বাঁধুনিতে আসুন । মানুষের দয়ার ওপর বসে থাকা
ভাল না ।
- দয়া মনে হয় না । কর্তব্যবোধে দেন ।
- কর্তব্যবোধ নয়, গিল্টি ফিলং থেকে দেন ।
এই পুরো
ফ্ল্যাটবাড়িতে , শর্মিলাই একমাত্র বান্ধবী লতিকার ।দুজনে
খোলাখুলিই মনের কথা বলে । শর্মিলা বিয়ের দুমাস পরই বিয়ে ভেঙে চলে এসেছে । প্রথমদিন
থেকেই স্বামীকে তার অপছন্দ । কারণটা সে অনেকবার বোঝার চেষ্টা করেছে , কিন্তু কোন
যুক্তিগ্রাহ্য করণ খুঁজে পায়নি । গড়পড়তা
দেখতে , অর্থনৈতিকভাবে স্বচ্ছল নীলাঞ্জনের সঙ্গে শর্মিলার বিয়ে যে ভেঙে যাবে ,
বিয়ের সময় কেউ আঁচ করতে পারেনি । অথচ বিয়েটা ভেঙে গেল । এই ব্যাপারটি একমাত্র আঁচ
করতে পেরেছিল শর্মিলা নিজে । ফুলশয্যার রাত থেকেই তার ভিষণভাবে অপছন্দ হয়েছিল
নীলাঞ্জনকে । তার এইরকম হয় । কাউকে কাউকে ভীষণ ভাল লেগে যায়। আবার
কারুর প্রতি তীব্র অপছন্দবোধ হয় তার- ঘৃণা শব্দটা এ ক্ষেত্রে ঠিক হবে না । লতিকাকে
এইভাবেই সে ভালবেসে ফেলেছে । তার সবচেয়ে রাগ হয় লতিকার ওপর । কীভাবে নিজের জীবনটা
নষ্ট করে চলেছে । অরিন্দম তো বিদেশে বসে ফূর্ত্তি করছে । আর
লতিকা ? তার স্ট্যাটাস যে কি সে নিজেও জানে না । অরিন্দমের দেওয়া টাকাগুলো রাস্তার
কুকুর বিড়াল আর নভোচরদের পিছনে ওড়ায় । সে নিঃসন্দেহ যে ব্যাঙ্কে লতিকার কোন সেভিংস
নেই । অরিন্দম টাকা পাঠানো বন্ধ করলেই – এবং একদিন সেটাই হওয়া স্বাভাবিক – লতিকা
পথে বসবে । এমন শিশুমনও মানুষের হয় ?
শর্মিলা
আবার বলল ,
- মেইন্টেনেন্স অবশ্য আমি আদায় করে ছেড়েছিলাম । একবার
ফোর নাইন্টি এইটের ভয় দেখালে , সুড়সুড় করে দিয়ে দেবে । একাই থেকে , ভালই আছি দেখছি
। ভাবছি একটি চাইল্ড অ্যাডপ্ট করব ।
শর্মিলা
খুব ডিমভাজা খেতে ভালবাসে । লঙ্কা-টোমাটো
দেওয়া গরম ডিমভাজা ফ্রাইপ্যান থেকে নামাতে নামাতে লতিকা বলল ,
- ফোর নাইন্টি এইট । সেটা কি ?
- বধূনির্যাতন । ছেলের পক্ষের পুরো গুষ্টি লক আপে চলে
যাবে । বুড়ো শ্বশুড়-শ্বাশুড়ি পর্যন্ত । জামিন অযোগ্য ধারা । এই ভয় দেখাতেই তো সব
পথে এল ।
ডিমভাজাটা
বেশ তাড়িয়ে তাড়িয়ে অনেকক্ষণ ধরে খেল শর্মিলা ।
লতিকা
আনমনে বলল ,
- আপনার কাছে কেউ এসেছিল , কোন মন্দিরের উদ্বোধন নিয়ে ?
- ওরকম তো কত আসে , নতুন কি ?
- গোবিন্দজীর মন্দির –
- বোধহয় আমি ছিলাম না । এলেও দরজা থেকে ওসব বিদেয় করে
দি । মন্দির করবে বলে টাকা দাও । আশ্চর্য ! আমার তো
ঠাকুরঘর আছে । তখন কি ওদের কাছ থেকে চাঁদা চেয়েছি ঠাকুর প্রতিষ্ঠা করব বলে ?
- আমার কাছে এসেছিল । তাড়িয়ে দিইনি । কিন্তু যেতে ইচ্ছে
করে না । মানুষ বড় শঠ হয় । মানুষের কাছে ভাল কিছু আশা করা যায় না । তার তৈরী
মন্দিরের কাছেও না , তার ভগবানের কাছেও না ।
- তোমার এমন নেগেটিভ অ্যাটিটিউড কবে থেকে হল ? এতো ভাল
নয় । পুরুষরা শঠ ঠিক । তাদের শঠতা আরো শঠতা দিয়ে ঠান্ডা করে দিতে হবে । তবে না
মানুষ । তাই তো বলছি ভাব , ভাব , ফোর নাইন্টি এইট তোমার দিকে ।
- মানুষের থেকে পশুরাও ভাল । তারা শঠ নয় ।
(৩)
মা-কুকুরটা
অনেকক্ষণ থেকে গরমে ধুঁকছে । সে সন্তানসম্ভাবা । নড়তে
পারছে না । লোম উঠে গিয়ে ঘি ঘি রঙ হয়েছে । পিছনের
বাঁ পায়ে একটি দগদগে ঘা হয়েছে । সেই পাটা সে টেনে চলে । বোধহয় বড় রাস্তায় কোন
অ্যাকসিডেন্ট হয়েছিল । লতিকার ফ্ল্যাটবাড়ির বাইরে সে ঘোরাফেরা করছে ।
লতিকা দুপুর
হলেই তাকে এসে খাওয়ায় । এই কুকুরটার সে নাম রেখেছে শুভ্রা । এঁটো-কাঁটা নয় ।
রীতিমত মাছ বা মাংস খাওয়ায় লতিকা । খাইয়ে তৃপ্তি পায় । শুভ্রার একটা স্বভাব আছে। খাওয়ার
পর সে জায়গাটা প্রদক্ষীণ করে । তারপর ছায়া দেখে গুটিসুটি মেরে শুয়ে পড়ে ।
আজ
শুভ্রার ঘাটা তুলো দিয়ে ওষুধ লাগিয়ে দিচ্ছে লতিকা । আগুন রোদ , খাঁ খাঁ রাস্তা ।
দূরে এক রিক্সাওয়ালা ভিজে গামছা মুখে দিয়ে ঘুমুচ্ছে । ঠিক তখনই একটি পরিচিত গলা
শুনে পিছন ফিরে তাকাল । সুব্রত বাগ । কাঁধে কাপড়ের ব্যাগ ।
- মা !
- সেকি আপনি ।
- তোমায় একটু কষ্ট দিতে আবার এলুম মা ।
- না , না , বলুন ।
- গোবিন্দজীর মন্দিরে রঙ হচ্ছে মা ।
- খুব ভাল ।
- সেখানে একটি অনাথ বাছুর আছে ।
সুব্রত
বাগের ঠোঁটে কৌতুকের হাসি । লতিকা একটু ভাবল । অন্ততঃ একবার না গেলে , সুব্রত বাগ
রোজ এসে উপস্থিত হবেন । সে আরেক বিরক্তিকর জিনিস । তাছাড়া এই গাভীটাকে দেখতে , তার
সেবা করতে বড় লোভ হচ্ছে । ওদের কষ্ট লাঘব করে যা আনন্দ পাওয়া যায় , জগতে তার কিসের
তুলনা ?
- ঠিক আছে যাব । এতবার করে বলছেন যখন ।
সুব্রত
বাগ মানুষটার কি কাজকর্ম কিছু নেই ? সংসারের কাজকর্মও কি কিছু নেই ? নাকি এই
গোবিন্দজীর মন্দির থেকে তার কিঞ্চিৎ উপায় হচ্ছে । নইলে রোজ এই উমেদারী কেন ? এই
কথাগুলি আভাসেমাত্র খেলে গেল লতিকার মনে । কারণ সত্যিই সে এত গুছিয়ে ভাবতে পারে না
। তার যে রকম মন চায় সে তাই করে । বিয়ের কিছুদিনের মধ্যেই ব্যাপারটা বুঝে গিয়েছিল
অরিন্দম । তাই হংকং বা অস্ট্রেলিয়া কোথাওই সে নিয়ে যায়নি স্ত্রীকে । লতিকা যেন
লাভসর্বস্ব সামাজিক বাজারে অচল পয়সা । বের করলে অপ্রস্তুত হতে হয় ।
ক্রমশ ……
৩য় পর্ব পড়ুন আগামী মঙ্গলবার ।
লেখকের
অন্যান্য লেখা পড়তে এখানে ক্লিক করুন ।
লেখক পরিচিতি –
জন্ম ১৯৭৪ । পেশায় চিকিৎসক , এমডি , ডিএম ( কার্ডিওলজিস্ট ) ।কবি , সমালোচক , রবীন্দ্র অনুরাগী ও শনিবারের চিঠির সম্পাদক সজনীকান্ত দাসের পৌত্র ।
ছোটগল্প প্রকাশিত হয়েছে নবকল্লোল , শনিবারের চিঠি ( নবপর্যায় ), সুদক্ষীণা , গল্পপত্র , কাথাসাহিত্য , শারদীয়া দক্ষীণীবার্তা , কবিতা ও গল্প বারোমাস , কালপত্রী , ইছামতি বিদ্যধরী, অন্ধপক্ষ প্রভৃতি পত্রিকায় ও নানা লিটল ম্যাগাজিনে।
গল্পগ্রন্থ : সৈকত শিল্পী , বনবিহঙ্গ ।
উপন্যাস: সমান্তরাল ।
.jpg)
