২য় ও শেষ পর্ব
যাদুপাহাড়
টোমাস মানের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ফসল। শ্বাসপ্রশ্বাস ঘটিত সমস্যার জন্য মানের
স্ত্রী কাটিয়াকে কয়েক মাস কাটাতে হয়েছিল সুইজারল্যাণ্ডের ডাভোস-এ অবস্থিত একটি
স্যানাটরিয়ামে। চিকিৎসা পদ্ধতির বিশদ এবং নিঁখুত বর্ণনা মান সযত্নে তুলে নিয়েছেন
ওখান থেকে। জার্মান ভাষায় ‘ bildungsroman’ উপন্যাসের
একটি বিশিষ্ট ধারা যাতে উপন্যাসের নায়ক বা মূল চরিত্রের শিক্ষা এবং অভিজ্ঞতা
অর্জনের মধ্য দিয়ে বড় হয়ে ওঠা দেখান হয়। কোন কোন সমালোচকের মতে মান শুধু এই
ধারাটিকে হ্যান্স ক্যাস্টর্পের অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের বাহন হিসেবেই ব্যবহার করননি, তিনি
এটিকে ব্যঙ্গও করেছেন। তেইশ বছর বয়সি, অপরিণত
মনের ক্যাস্টর্প যাকে মানবতাবাদী সেত্তেমব্রিনি অভিহিত করেছিলেন ‘ জীবনের পলকা শিশু’
বলে সে যাদুপাহাড়ে সাত বছরে শিল্প, সাহিত্য, দর্শন, সমাজনীতি, সঙ্গীত, প্রেম এবং
মৃত্যুর অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে ঋদ্ধ হল, রূপান্তরিত
হল একজন অভিজ্ঞ পরিণত মনের মানুষে। মানের চিন্তা জগতে গ্যোয়টে, শোপেনহাউয়ার, নীটশে এবং
অন্যান্য জার্মান ও য়ুরোপীয় চিন্তাবিদদের যে প্রভাব পড়েছিল তা প্রত্যক্ষ করা যায়
এই বিশাল উপন্যাসের পাতায় তাঁর অসাধারণ বিশ্লেষণী শক্তি এবং কাহিনির উপস্থাপনায়।
নীটশে বিশ্বাস করতেন অসুস্থতার সঙ্গে সৃজনশক্তির একটি ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। টোমাস
মানও বিশ্বাস করতেন যে অসুখকে নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখা উচিৎ নয়। যাদুপাহড় উপন্যাসে
ক্যাস্টর্প এক যক্ষাগ্রস্ত রোগি কিন্তু তার এই দীর্ঘকাল ব্যাপী অসুস্থতা এবং তার
মৃত্যুর সঙ্গে বার বার মুখোমুখি হওয়ার অভিজ্ঞতাই তাকে একজন পূর্ণাঙ্গ, সচেতন এবং
সংবেদনশীল মানুষ হিসেবে তৈরি করে নেয়। তাই ক্যাস্টর্পকে আমরা বার বার দেখতে পাই
মৃত্যুপথযাত্রী রোগিদের শিয়রে হাজির হতে, তাদের
হাতে তুলে দিতে ফুলের তোড়া কিংবা এগিয়ে দিতে জলের গ্লাস। ১৯৫৩ সালে আমেরিকার দ্য
এ্যাটলাণ্টিক পত্রিকায় যাদুপাহাড় উপন্যাসটির আলোচনা প্রসঙ্গে মান তাই বলেছিলেন, ‘ What (
Hans) came to understand is that one must go through the deep experience of
sickness and death to arrive at a higher sanity and health . . .’
টোমাস মানের জন্ম ৬ই জুন, ১৮৭৫ সালে
জার্মানির ল্যুইবেক শহরের এক ধনী শস্য ব্যবসায়ীর পরিবারে। ১৮৯১ সালে তাঁর পিতা
ইয়োহান হাইনরিশ মানের মৃত্যুর পর মানদের পৈতৃক ব্যবসাটি বন্ধ হয়ে যায় এবং মান
পরিবার চলে আসে মিউনিকে। মানের প্রাথমিক পড়াশুনা ল্যুইবেকের একটি বিদ্যালয়ে, পরে তিনি
মিউনিকে এসে পড়াশোনা করেন লুড্উইগ ম্যাক্সিমিলিয়ান্স বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং মিউনিক
টেকনিকাল বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৮৯১ থেকে ১৯৩৩ সাল তিনি প্রধানত মিউনিকেই বসবাস করেন।
১৮৯৪-৯৫তে মান কাজ করেছেন একটি ফায়ার ইন্সিওরেন্স কোম্পানিতে। ১৯০৫এ মান বিয়ে করেন
একজন অবস্থাপন্ন ইহুদি শিল্পপতির কন্যা কাটিয়া প্রিংগেইশমকে। তাঁদের ছয়টি সন্তানের
মধ্যে তিনজন – এরিকা মান, ক্লাউস মান এবং গোলো মান –
উল্লেখযোগ্য জার্মান লেখকদের মধ্যে পড়েন। ১৯৩৩ সালে হিটলার ক্ষমতায় এলে টোমাস মান
পালিয়ে গিয়েছিলেন সুইজারল্যান্ডে। ১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শুরু হলে তিনি চলে
যান আমেরিকা। আমেরিকা থেকে রেডিওতে নাজি-বিরোধী প্রচারে সক্রিয় ছিলেন মান।
হিটলারকে ব্যঙ্গ করে তিনি একবার রেডিওতে বলেছিলেন – ‘The war
is terrible, but it has the advantage of keeping Hitler from making speeches
about culture.’ ১৯৫২ সালে আমেরিকা থেকে ফিরে
আসেন তিনি সুইজারল্যান্ডে। ওখানেই টোমাস মান প্রয়াত হন ১২ই আগস্ট, ১৯৫৫
সালে।
১৯০১ সালে মাত্র ২৬ বছর বয়সে
প্রকাশিত টোমাস মানের প্রথম পূর্ণাঙ্গ উপন্যাস বুডেনব্রুক্স তাঁকে জার্মান তথা
য়ুরোপীয় সাহিত্যে খ্যাতি এবং সম্মান এনে দিয়েছিল। এই উপন্যাসে তিনি বর্ণনা করেছেন
জার্মানির ল্যুইবেক শহরের একটি অভিজাত উচ্চবিত্ত পরিবারে চার প্রজন্মের উত্থান ও
পতন। দ্য ম্যাজিক মাউন্টেন আর বুডেনব্রুক্স
এ দুটি উপন্যাসই তাকে এনে দিয়েছিল নোবেল পুরষ্কার ১৯২৯ সালে। মানের অন্যান্য
উল্লেখযোগ্য উপন্যাসগুলোর মধ্যে রয়েছে ডেথ ইন ভেনিস (১৯১৩), ডক্টর
ফাউস্টুস(১৯৪৭), জোসেফ এ্যান্ড হিজ ব্রাদার্স
(বাইবেলের সময়কার ঘটনা নিয়ে লেখা চার খন্ডের উপন্যাস)এবং তাঁর শেষ অসমাপ্ত উপন্যাস
কনফেশনস অফ ফেলিক্স ক্রুল (১৯৫৪)। টোমাস মান যে বিশ্লেষনাত্বক বাস্তবতাকে তার
লেখার বাহন করেছিলেন তাকে ক্রিটিকাল রিয়েলিজ্ম বলা হয়ে থাকে। ১৯৯৯ সালে সাহিত্যে
নোবেল পুরষ্কার বিজয়ী প্রখ্যাত জার্মান ঔপন্যাসিক গ্যুন্টার গ্রাস মানের জন্মস্থান
ল্যুইবেক শহরে টোমাস মান পুরষ্কার গ্রহন করার সময় বলেছিলেন, “এ কথা ঠিক
নয় যে লোকে তাকে ভুলে গেছে। বেতারে তাঁর রচনা থেকে যখন পাঠ করা হয় তখন সবাই তাঁর
কথা খুব আগ্রহ সহকারেই শোনে।”
টোমাস মানের যাদুপাহাড় এমন
একটি অসাধারণ উপন্যাস যার প্রাসঙ্গিকতা আজ একশো বছর পরেও শেষ হয় যায়নি। ২০২০ সালে
কোভিড ১৯ ছড়িয়ে পড়লে এবং সমগ্র পৃথিবির মানুষ গৃহবন্দি হয়ে পড়লে এই উপন্যাসটির
নাট্যরূপকে সামনে নিয়ে আসে বার্লিনের ডয়েশ থিয়েটার কেননা মানের এই উপন্যাস তো
শ্বাসপ্রশ্বাস ঘটিত রোগের কারণে দীর্ঘকাল স্যানাটরিয়ামে আবদ্ধ থাকার কাহিনি যার
পুনরাবৃত্তি হল করোনাকালে। নভেম্বর ২০২০-এ সেবাস্তিয়ান হার্টম্যান তাই যাদুপাহাড়কে
উপস্থাপনা করলেন এক অভিনব রূপে – দর্শকহীন প্রেক্ষাগৃহে অভিনীত হল যাদুপাহাড়।
অভিনেতারা করোনাকালের প্রোটোকল মেনে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে অভিনয় করলেন যা
ইন্টারনেটে লাইভস্ট্রিমে দেখান হয়েছিল। তাঁর আশি বছরের দীর্ঘ জীবনে টোমাস মান
লিখেছেন ৮টি পূর্ণাঙ্গ উপন্যাস, ১২টি
উপন্যাসিকা, ২১টি গল্প, কিছু
কবিতা এবং বেশ কিছু প্রবন্ধ। মানের ‘দ্য ট্রান্সপোজড হেড্স’ উপন্যাসিকাটিকে নিয়ে
নাট্যকার-পরিচালক গিরিশ করনাড রচনা করেছিলেন ‘হায়াবাদন’ নামক একটি নাটক যা তিনি
যক্ষগণ থিয়েটার রীতিতে পরিবেশন করেছিলেন।
তথ্য ঋণ
১) দ্য ম্যাজিক মাউন্টেন, পেঙ্গুইন
বুক্স, ১৯৬০
২) উইকিপিডিয়া এবং অন্যান্য আন্তর্জাল প্রবন্ধ
৩) টোমাস মান – একটি নক্ষত্রের নাম - ড. দেবব্রত চক্রবর্তী, bdnews24.com (২২শে নভেম্বর, ২০১৯) ।
লেখকের অন্যান্য লেখা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।
লেখক পরিচিতি
জন্ম এবং শিক্ষা কলকাতায়; কর্মজীবন দিল্লিতে, কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রালয়ে। গল্প লেখার শুরু ষাটের দশকের শেষ দিকে। বাংলা এবং ইংরেজি দুই ভাষায় সাহিত্য চর্চা করে আসছেন গত পঞ্চাশ বছর ধরে। ইংরেজিতে দেশে এবং বিদেশে ওঁর কিছু গল্প এবং তিনটি উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে। বিবিসি থেকেও কয়েকটি গল্প প্রচারিত হয়েছে। বাঙলায় চারটি উপন্যাস এবং দু’টি গল্পগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। দেশ, আনন্দবাজার, সাপ্তাহিক বর্তমান, নবকল্লোল, পরিচয়, কালি ও কলম(বাংলাদেশ) এবং দিল্লি ও কলকাতার অনেক সাহিত্য পত্রিকায় গল্প লেখেন নলিনাক্ষ। দিল্লি থেকে প্রকাশিত ‘ কলমের সাত রঙ’ পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত আছেন।
