Advt

Advt

nimantran-galpo-story-1stpart-by-dr.sunandan-shikdar-tatkhanik-digital-bengali-web-bangla-online-e-magazine-নিমন্ত্রণ-ডাঃসুনন্দন-শিকদার

ধারাবাহিক গল্প

nimantran-galpo-story-1stpart-by-dr.sunandan-shikdar-tatkhanik-digital-bengali-web-bangla-online-e-magazine-নিমন্ত্রণ-ডাঃসুনন্দন-শিকদার

১ম পর্ব 

(১)

বাকিটা কোন দিনও ফিরৎ দেয় না দোকানদাররা । তাতে অবশ্যি লতিকার কিছু যায় আসে না । বাজারে গেলে সে রাণী । দুধওয়ালা পটলওয়ালা থেকে মাছওয়ালা পর্যন্ত সবাই অন্যান্য অবান্তর খরিদ্দার সরিয়ে লতিকার নজর কাড়ার আশায় হাঁকডাক করতে থাকে । লতিকা এগিয়ে এলে, নিজের মোড়াটা পর্যন্ত এগিয়ে দেয়। না দিলেও যে লতিকার কিছু আসে যায় তা নয় । 

খামখেয়ালিপনা তার দূরারোগ্য ব্যাধি । সে কোন ফর্দ্দ করে বাজার যায় না । বাজারে ঢোকার পর যেদিন যেরকম ইচ্ছে তাই কেনে । আলু , পটল , বেগুন না টোমাটো কোনটা কিনবে সেই মুহূর্ত্তে সে ঠিক করে ফেলে । দোকানীরা তা জানে । তাই এই নজর কাড়ার প্রতিযোগীতা । যদি শিকে ছেঁড়ে । যে দাম দর করে না , খাতায় লিখে জিনিস কেনে , টাকার হিসেব রাখে না , আবার মাসের শেষে নোটের বান্ডিল দিয়ে ধার শোধ করে , ফিরৎটা নিতে ভুলে যায় , এমন খরিদ্দার কোথায় পাবে ? লতিকার জন্য তাই হুড়োহুড়ি ।

লতিকা বেশ সাধারণ দেখতে । রংটা চাপা । বিশেষত্বের মধ্যে পিঠ পর্যন্ত চুল । আজ সে পড়েছে নীল চুড়িদার , শাদা ওড়না । দাঁড়য়েছে তপনের কাঠের বক্স-দোকানের সামনে। তপন দুধবিক্রেতা । সার সার ঘন শাদা দুধের পাউচ প্যাকে সমৃদ্ধ দোকানঘর। লতিকার হুকুমে আজ পাউচগুলো নীল ক্রেটগুলি থেকে নিয়ে একসাথে করতে থাকে তপন । বেশ কটি ফুটো পাউচ সে অনর্গল কথা বলতে বলতে, এক ফাঁকে ঢুকিয়ে দেয় ।লতিকা বলল ,

-    কত হল ।

-    চার প্যাকেট , আশি টাকা ।

-   লিখে রাখুন ।

-   পনেরশো টাকা হয়ে গিয়েছে দিদিমণি। সামনের মাসের পয়লা তারিখে –

-   নিশ্চই ।

ষোলোশো টাকা বললেও ক্ষতি ছিল না । মাত্র চারশো টাকার যে গরমিল, তা কেবল তপনের কৃপা । হিসেব শুধু যে তপনের খাতায় সংরক্ষিত তা সে ভালই জানে । লতিকা দুধের প্যাকেট থলেতে রাখতে রাখতে এদিক ওদিক দেখছে । নিমণ্ত্রিত অতিথিরা এসেছে কিনা । না , ঝড়-বৃষ্টি হলেও তারা লতিকাকে মিস্ করে না । সবচেয়ে আগে এল একটি লোমওঠা বেড়াল । সেই দুধের মুখ্য দাবীদার । সে এসে ব্যাগটি দেখে জিভ চাটলতারপর ফুটপাতে পড়তে থাকা দুধ সপসপ করে চেটে নিলআরো কয়েকটি বিড়াল এবং কাকও এসে জুটল    

  বাড়ির পথে এরা সাথী হলে খুশিই হয় লতিকা । নিমন্ত্রিতরা সগর্বে এলে কে না হয় ? যেতে যেতে টপটপ করে দুধ পড়ছে আর তাঁরা চেটেপুটে নিচ্ছেন , এ দেখলে কে না হয় ! বাস্তার ধারেই লতিকার ফ্ল্যাটবাড়ি । রিক্সাওয়ালা গোপাল রোজই সাইকেল রিক্সার ওপর বসে বসে ঢোলে। একগাদা কাক আর বিড়ালের কলরব শুনে সে বলে ওঠে ,

-   দিদিমণি দুধটুকু সব পড়ে গেল গো ! বিড়ালে খেয়ে নিল ।

দিদিমণি পিছন ফিরে দেখলও না । সিকিউরিটিবিহীন দরজা খুলে উঠে গেল লতিকা। তার ফ্ল্যাট তিন তলায়। লিফট নেই । ফ্ল্যাটের দরজা সে হামেশাই তালা দিয়ে বেরুতে ভুলে যায় । অঘটন যে ঘটেনি সে কেবল তার কপালগুনে । আজ সে ফ্ল্যাটের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে গেল । দরজাটা আধভেজানো । এখনো পর্যন্ত পাল্লাটি সে খুলে কখনো বেরোয়নি । তাহলে পাল্লাটা এভাবে থাকার রহস্য কি ? ঠিক তখনই পিছনে শব্দ হওয়ায় ফিরে তাকাল লতিকা । কাঁধে কাপড়ের ব্যাগ এক প্রৌঢ় দাঁড়িয়ে । সিঁড়িতে তাঁরই চটির শব্দ পাওয়া যাচ্ছিল তিনি দাঁড়িয়ে তিনতলা আর চারতলার মধ্যেকার ল্যান্ডিং-এ । তিনি নামতে নামতে বললেন ,

-   মা আমার !

আশ্চর্য হয়ে গেল লতিকা । ইনি কে ? ওঁকে তো কখনো দেখেনি সে। তার সাথে কিসের দরকার ? ভিতরে নিয়ে বসানো উচিত কি উচিত না এ কথা কখন তার মাথায় আসে না । আগে পিছে না ভেবে সে বলল ,

-   ভিতরে আসুন ।

ভদ্রলোককে এবার সে খেয়াল করল । মুখে সামান্য হাসিটুকু লেগে আছে । মাথার সামনেটা টাক । চোখে কালো ফ্রেমের চশমা । পরনে মলিন ধুতি । কাপড়ের ব্যাগ থেকে কতগুলি কার্ড উঁকি দিচ্ছে । হাউই চটি পরা পা ফুটিফাটা । ভদ্রলোক যেন লতিকার মনের ভাব বুঝে বললেন ,

-   একটু বসতে দেবে মা ?

-   ছি , ছি দেখেছেন আমি আপনাকে দাঁড় করিয়ে রেখেছি । বসুন , বসুন ।

-   দরজাটা ভেজানো ছিল , বুঝতে পারিনি । একটু ঠেলা দিয়েছিলাম আর কি ।

-   বলুন –

-   কি ভাবে শুরু করব বুঝতে পারছি না ।

কেউ যদি কি ভাবে শুরু করবে বুঝতে না পারে , তবে কঠিন কিছু বলার চেষ্টা করছে তা ধরে নেওয়া যায় । অনেকেই প্রসঙ্গের ইতি টানার জন্য বলতে পারে আমি ভিষণ ক্লান্ত , বা এক্ষুণি গেস্ট আসবে , পরে শুনব । কিন্তু লতিকা সরলভাবে বলে ফেলে ,

-   বেশ তো বলুন না । আমি বরং এক গ্লাস জল নিয়ে আসি ।

-   যদি একটু মিষ্টিমুখ করানো যায় মা ।

-   বেশ তো । ফ্রিজে কিছু পাওয়া যাবে নিশ্চই ।

-   আঃ । এই গরমে ঠান্ডা জল আর মিষ্টি । ডাইবিটিস যবে থেকে হয়েছে তবে থেকে মিষ্টি খাবার জন্যে মনটা কবলই ছোঁক ছোঁক করে ।

-   তবে তো মিষ্টি খাওয়াই উচিত নয় । ইস আপনার নামটাই তো জানা হয়নি ।

-   দেখেছ মা ! মন কেমন সুবিধাবাদী , কেবল ধান্দায় , ধান্দায় ঘোরে । পরিচয়ই দিতে ভুলে গেলাম !

-   বলুন –

-   আমি সুব্রত বাগ । আমি সেবক ।

-   সেবক ? কিসের সেবক ?

-   ঠাকুরসেবক । আমরা গোবিন্দজীর মন্দির গড়ে তুলছি । কাজ অনেকটা এগিয়ে গেছেমা , তোমার মন অনেক বড় । যদি কিছু সাহায্য করতে পার ।

লতিকা দোনামনায় পড়ে গেল । সে কি করবে ? সেও এইটুকু বোঝে , যে অপরিচিত এক ব্যক্তির হাতে এইভাবে টাকা তুলে দেওয়া যায় না । সে একটু ভেবে বলল ,  

-   আমিও চাই সাহায্য করতে । একটু সময় দিন ।

-   আমি জানি মা তুমি খুব দয়ালু । পরশুদিন আমি দেখেছিলাম বিলাসের দোকান থেকে এক বাক্স মিষ্টি কিনে নিয়ে , তুমি কিভাবে কাকেদের খাওয়াচ্ছিলে । মানুষ কি দোষ করল মা ?

লোকটা সহজে ছাড়বে না , তা বোঝা যাচ্ছে । লতিকা ফ্রিজ ঘেঁটে দুটি সন্দেশ আর এক গ্লাস জল নিয়ে এল । সুব্রত বাগ প্লেটটা এমন ভাবে নিলেন যেন কতদিন খাননি । টপ করে সন্দেশটি মুখে পুরে আয়েস করে চিবুতে লাগলেন । একটি সুখের আবেশ ফুটে উঠল চোখে । গোবিন্দজীর সেবায় নেমে যে সন্দেশ-সেবাটা উপরি পাওয়া গেল , তা তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করছেন ভদ্রলোক । একটি কার্ড এগিয়ে দিলেন  ,

-   মন্দিরের উদ্বোধনের দিন সবাইকে নিয়ে এস মা । নাম গান হবে , ভোগ খাওয়া হবে দুপুরে । আসতে হবেই মা , নিমন্ত্রণ রইল ।

ভদ্রলোক চলে যাবার সময় তাঁকে প্রায় সিঁড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে এল লতিকা     

লতিকার আশ্চর্য লাগছে , ভদ্রলোক তার সম্বন্ধে এত কথা জানলেন কি করে । সে প্যাকেটের বাকি দুধটুকু একটি ছোট প্লেটে ঢেলে বারান্দায় রেখে দিল । কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই কাকের কোলাহলে পরিপূর্ণ হয়ে গেল বারান্দানীল আকাশ , বারান্দা ভাসানো রোদ্দুর , সমস্তই যেন ঢেকে গিয়েছে কালো ডানায় । তারা জানে এটাই রোজকার রুটিন ।

দরজায় বেল বাজল । নিশ্চই রাঁধুনি । নামও তার বেশ নজর কাড়া – নিরাশা । লতিকার অপচয় দেখে বলতে বলতে সেও হাল ছেড়ে দিয়েছে । সে বরং নিজেই সুযোগ বুঝে কিছু হাতসাফাই করে । ঢুকেই চক্ষের নিমেষে তরকারি কাটতে বসে যায় নিরাশা । এক একটি ফ্ল্যাটের কাজ দেড় –দুই ঘন্টার মধ্যে তাকে সারতে হবে । গ্যাসের ওভেনে ভাত আর তরকারি একসঙ্গে বসাল নিরাশা । এর ফাঁকে সে গতদিনের এঁটো বাসনগুলি মাজতে শুরু করে । বাসনমাজার জন্য চুক্তি অনুযায়ী সে আলাদা টাকা পায় ।

লতিকার কিছু মনে থাকে না । এসব জিনিষ আগে থেকে পরিস্কার করে নেওয়া ভাল তাই নিরাশা বলল ,

-   কাল পয়লা তারিখ মা ।

অর্থাৎ মাইনের টাকাটা যেন রেডি করে রাখে । লতিকার স্মৃতিমন্দির মাঝে মাঝে ঘন্টি নেড়ে সচকিত  করে দিলে প্রসাদ পেতে সুবিধা হয় ।

অর্থ সংস্থান করতে হবে । কথাটা মন্দ বলেনি নিরাশা । কিন্তু অর্থ সংস্থানের চাবিকাঠি এখানে নয় । সুদূর অস্ট্রেলিয়ায় । অরিন্দম টাকা পাঠানোয় কোন কার্পন্য করে না । এখন অরিন্দম অফিসে আছে নিশ্চই । ফোন করাটা ঠিক হবে না । বিরক্ত হতে পারে । এইটুকু লতিকা বোঝেস্বামীর প্রতি বিশেষ আবেগ নেই এখন  । কেবল মনে দূঃখ রয়ে যায় । ঘূণাক্ষরেও বিদেশে সে তার কর্মস্থলে আসতে বলে না । বছরে দশ বারোদিনের জন্যে এসে সে  এই ফ্ল্যাটে থেকে আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা করে যায় । আর মাসে মাসে টাকা পাঠায় । স্ত্রী লতিকার সঙ্গে অরিন্দমের সম্পর্ক এতটুকু ।

বিদেশে কি আরেকটি বিবাহ করেছে অরিন্দম ? গতবছর সে যখন এয়ারপোর্টে-এ যাবার জন্যে বের হচ্ছে , সিঙ্গাপুরগামী বিমান ধরবে , তখনই কথাটি মনে এসেছিল লতিকার । নয়ত এত খুশির কারণ কি ? একমাত্র স্ত্রীর কাছ থেকে বিদায় নিলে কারুর কি এত খুশি থাকে মনে ? ব্যাপারটা অরিন্দমের মতই রহস্যময় । ফোন করবে কি করবে না ভাবতে ভাবতে এইসব কথা মনে ঢেউ দিয়ে গেল

ফোনটা সে রাত্রের দিকেই করবে ।

লোকে বলে অরিন্দম বিপুল সম্পদের মালিক । একটি স্পোর্টস গুডস কোম্পনির ভাইস প্রেসিডেন্ট । মাত্র চার বছর হল হংকং থেকে কোম্পানি বদলে সিডনি এসেছে । এই সম্পদ সে কোথায় কিভাবে জমা রেখেছে লতিকাকে সে জানানোর প্রয়োজন মনে করেনি ।

লতিকার সঙ্গে ডিভোর্সও হয়নি , হয়নি সেপারেশনও । এই টাকাটাকে তাই খোরপোষ হিসেবে বলা যাবে না । তবু নির্ধরিত দিনেই নিয়মিত টাকা আসে । পুব দিকে সূর্য না উঠতে পারে , কিন্ত টাকা আসা এক দিনও দেরী হয় না । মাসে দুচারবার ফোনালাপ আর দশ-বারো দিনের ঝটিকা সফর ছাড়া লতিকার সঙ্গে অরিন্দমের আর কোন সম্পর্ক নেই এটাই লতিকার জীবনে নির্মম সত্য ।

ক্রমশ ……

২য় পর্ব পড়ুন আগামী মঙ্গলবার  

লেখকের অন্যান্য লেখা পড়তে এখানে ক্লিক করুন ।

লেখক পরিচিতি –

জন্ম  ১৯৭৪  পেশায় চিকিৎসক এমডি , ডিএম  কার্ডিওলজিস্ট ) কবি , সমালোচক , রবীন্দ্র অনুরাগী  শনিবারের চিঠির সম্পাদক সজনীকান্ত দাসের পৌত্র 

ছোটগল্প প্রকাশিত হয়েছে নবকল্লোল , শনিবারের চিঠি ( নবপর্যায় ), সুদক্ষীণা , গল্পপত্র , কাথাসাহিত্য , শারদীয়া দক্ষীণীবার্তা , কবিতা  গল্প বারোমাস , কালপত্রী , ইছামতি বিদ্যধরী অন্ধপক্ষ প্রভৃতি পত্রিকায়  নানা লিটল ম্যাগাজিনে

গল্পগ্রন্থ : সৈকত শিল্পী , বনবিহঙ্গ  

উপন্যাস:  সমান্তরাল