‘তৃতীয় সুর, ষষ্ঠ সুর/গুপি চললো
অনেকদূর’
তৃতীয় সুর ‘গা’ আর ষষ্ঠ সুর ‘ধা’-দুইয়ে মিলে
গাধা। গাধা নিয়ে পৃথিবীতে প্রচুর গল্প প্রচলিত আছে। প্রতিনিয়ত পৃথিবীতে গাধার জন্ম
হচ্ছে। অথচ গাধার মৃত্যু হার কম। তাই চাহিদা যোগানের সামঞ্জস্যহীনতার জন্য ইদানিং
গাধাদের সংখ্যা বাড়ছে, গাধাদের গল্প বাড়ছে। গাধা সংরক্ষণে এবং সংস্কারে সরকার
বাহাদুর ইতিমধ্যে অনেক পরিকল্পনা নিয়েছেন। ‘গাধাকে মানুষ করা’ সেই প্রকল্পের
অন্যতম।
না, গাধাকে মানুষ করার মতো
গোলমেলে বিষয়ের মধ্যে আমরা আজ ঢুকবো না। গাধাতেই আজ আমাদের বিচরণ। কিছুদিন আগের
কথা। সকাল বিকল গড়ের মাঠে তখন অনেক গাধা চরে বেড়াত। গাধাগুলো আসতো কোথা থেকে,
ফিরে যেতই বা কোথায়, তা কে জানে। তবে সকাল বিকাল তারা ঘোরাঘুরি করে বেড়াত।
পিতা তার বালকপুত্রকে নিয়ে
মর্নিং ওয়াক করতে বেরিয়েছেন। পুত্র এটা সেটা প্রশ্ন করে, পিতা তার উত্তর দেন।
বেড়াতে বেড়েতে বালকপুত্র
দেখলো মাঠে চরে বেড়াচ্ছে কতগুলো জন্তু। বইতে লেখা আছে অ্যাস (Ass)। অ্যাস মানে গাধা। এগুলো তাহলে
গাধা, আর পিছনের গুলো গাধার বউ।
পুত্র:
বাবা, এগুলো কি জন্তু?
পিতা: এগুলো
গাধা।
পুত্র: আর
পিছনের গুলো?
পিতা: ওগুলো গাধার বউ।
পুত্র: বাবা,
গাধা কি বিয়ে করে?
পিতা: হ্যাঁ,
গাধারাই শুধু বিয়ে করে।
পুত্র: মা
হল তোমার বউ। তুমি মাকে বিয়ে করেছ।
পিতা: হ্যাঁ,
করেছি।
পুত্র: তুমি
তাহলে-
তারপরেই
পুত্রের গন্ডদেশে পিতার চপেটাঘাত। বাঁদর ছেলে। বাড়ি চলো। আজ তোমার হচ্ছে। কি
কারণে যে পিতা চটে গিয়ে তকে চপেটাঘাত করলো বালকপুত্র তা বুঝতে পারল না।
দুই গাধা। ভীষণ বন্ধুত্ব তাদের। মালিক পৃথক। এক
গাধা বলে, আমার মালিকটা একেবারে চামার। সারাদিনে এক মুহুর্ত জিরেন দেয় না।
-আমারটাও ছিল। টাইট দিয়ে দিয়েছি।
-কি করে দোস্ত, আমায় বল।
-শোন, পিঠে যখন অনেক মাল চাপাবে নদী পার হওয়ার
সময় ইচ্ছে করে নদীতে পড়ে যাবি। তারপর দেখিস মজাটা কি হয়। তোর মালিকের নুনের
কারবার তো?
-হ্যাঁ।
-ভালো। কাল সকালে নদী পার হওয়ার সময় পড়বি
নদীতে।
পরদিন সকালে মালিক গাধার
পিঠে চাপাল অনেক নুনের বস্তা। তারপর গাধাকে রওয়ানা করিয়ে দিয়ে হিসেবের খাতা নিয়ে
বসল। হিসেব, হিসেব। হিসেব করতে করতে সে নিজেই চলে যাচ্ছে হিসেবের বাইরে।
মাথার ওপরে নীল আকাশ। পিঠে
নুনের বোঝা বেশ ভারি লাগলেও সে চলছিল দুলকি চালে। একটু পরেই বন্ধুর বুদ্ধিকে কাজে
লাগাতে হবে।
পিঠে নুনের বস্তা নিয়ে পুলের/ব্রীজের
ওপর উঠল। তারপর আশপাশটা দেখে নিয়ে ঝুপ করে নদীর মধ্যে লাফ। অমনি ম্যাজিক। জলে
নুনসব গেল ধুয়ে। গাধা দেখল পিঠে তো আর কোনো বোঝা নেই। বড়ই হালকা লাগছে নিজেকে।
কামাল কিয়া গাধা মিঞা। নিজেই নিজের পিঠ চাপড়ে দিল। তারপর গেল মালিকের কাছে। মালিক
বুঝল সর্বনাশ কতটা হয়েছে, বেচারা পা হড়কে পড়ে গেছে, কি আর করবে। বললেন- যা এখন
বিশ্রাম নে, কাল সকালে নুনগুলো পৌঁছে দিস।
পরের দিনও একই কান্ড। গাধা
পড়ল, নুন গলল। হালকা হল গাধা। গাধার তখন চিৎকার করে খেয়াল গাইতে ইচ্ছে করছে।
চমৎকার বুদ্ধি দিয়েছে বটে বন্ধু। বন্ধুকে একদিন খাওয়াতে হবে।
তৃতীয়দিনও একই ঘটনা। ঘটার
পর মালিক বুঝলেন এর ভেতরে কোনও রহস্য আছে। গাধাটাকে। একটু শিক্ষা দেওয়া দরকার।
তিনি নুনের বদলে গাধার পিঠে চাপালেন তুলোর বস্তা। আজও হালকা। গাধা তো দারুণ
খুশি। পক্ষীরাজের মতো আজ পৌঁছে যাবে।
পুলের/ব্রীজের কাছে গিয়ে
এদিক ওদিক দেখে নদীতে দিল ঝাঁপ! তারপরেই বলে উঠলো বাপ রে বাপ! এতদিন নুন সব গলে
গিয়ে বস্তা হয়েছে ফাঁকা। আর আজ তুলো ভিজে গিয়ে এক একটা বস্তা হয়েছে তিনমণ ভার।
কোনো মতেই সে আর উঠে দাঁড়াতে পারছে না। জলে মধ্যে হাবুডুবু খাচ্ছে।
মালিক নদীর ঘাট থেকে তুলল
তুলোর বস্তা আর গাধাকে। সে তখন ঠকঠক করে কাঁপছে। তার প্রাণবায়ু গলার কাছে এসে
আটকে আছে। বন্ধুর সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিন্ন হয়েছে। মালিকের সব কথা সে অক্ষরে অক্ষরে
মানে। সে বুঝেছে গাধার চেয়ে মানুষের বুদ্ধি বেশি।
এবার গাধা হারানো। গাধা
হারিয়েছে একজনের। সারাদিন মাল বয়। কাজা কামাই। তাই সাত সকালেই গাধা খুঁজতে
বেরিয়েছেন তিনি। সারাদিন বনে বাদাড়ে ঘুরে হাত পা গেছে ছড়ে। পিপাসায় গলা কাঠ।
দাওয়ায় বসে পড়ে সামনে ছেলেকে দেখে তাকে ডেকে বললেন,
-একগ্লাস জল দাও তো ভাই।
বৌ ছিল কাছেই। ঝঙ্কার দিয়ে
বলল, তোমার কি ভিমরতি হয়েছে নাকি যে ছেলেকে বলেছো ভাই?
ঢকঢক করে জল খেয়ে উঠে পড়ে
বৌকে বলল, গাধা হারালে ওরকম হয় মা।
আচ্ছা গাধার গলায় কি বকলস
থাকে? মনে করতে পারছি না ঠিক। একবার মনে হচ্ছে থাকে একবার মনে হচ্ছে থাকে না।
একদিন বাবা অফিস থেকে এসে ঘোষণা করলেন, এবার গাধার গলায় বকলস লাগানো হবে। কোথায়
যেন তিনি গেছিলেন, সেখানে দেখে এসেছেন। ভেরি কিউট।
আমাদের চারটে গাধা। বাবা
আমাকে চারটে বকলস কেনার নির্দেশ দিয়ে হাতে টাকা গুঁজে দিলেন।
আমি দুপুরবেলা বেরিয়ে
পড়লাম। গাধা যখন পাওয়া যায়, গাধার বকলসও পাওয়া যাবে।
লোকে বলে টাকা থাকলে
কলকাতা শহরে বাঘের দুধ মেলে। কিন্তু গাধার বকলস মেলে না!
বকলস কোন্ দোকানে পাওয়া
যেতে পারে! দু’চারটে দোকানে জিজ্ঞেস করলাম। তারা হাসাহাসি করলো, কিন্তু হদিশ দিল
না। আর একটা জিনিস তখন মাথায় এলো। কুকুরের বকলস আর গাধার বকলস প্রায় একইরকম হবে।
কুকুরের বকলস পাওয়াটা সোজা। চলে গেলাম গড়ের মাঠে। সেখানে বলায় বকলস লাগানো কুকুর
নিয়ে কজন ঘুরছেন।
-ম্যাডাম শুনছেন?
-বলুন।
-কুকুরের বকলসটা খুব
সুন্দর।
-হুম্।
-কোথাথেকে কিনলেন?
-দোকান থেকে?
-কোন দোকানে?
-কুকুরের দোকানে।
-কি কুকুর?
-বিলিতি কুকুর।
-ঠিকানাটা বলবেন। আমি
কিনবো। আজই।
-কুকুর সঙ্গে আনলে ভালো
করতেন।
-কুকুরের নয়।
-এই যে বললেন কুকুরের।
-কুকুরের নয়, গাধার। আমাদের
বাড়িতে চারটে গাধা আছে। বাবা বললেন, বকলস কিনে আন। তাই বেরিয়েছি। আপনার গলায়, থুড়ি
আপনার কুকুরের গলায় বকলস দেখে ভাবলাম যদি আপনি আমাকে কোনও সাহায্য করতে পারেন।
সকলের তরে সকলে আমরা, প্রত্যেকে আমরা ‘নিজের’ তরে।
কেমন
অবাক ব্যাপার দেখুন, গাধার বেল্ট কিনতে গিয়ে কুকুর সঙ্গী সেই মহিলার সঙ্গে ভাব হয়ে
গেল, আমরা পার্কে ঘুরলাম, রেস্টুরেন্টে খেলাম, ফোন নম্বর দেওয়া নেওয়া করলাম।
ঘন্টা দুয়েকের মধ্যে কুকুরসঙ্গী তরুণী আমাকে, ‘তুমি’, ‘ওগো শুনছো’, ‘বলি কানের
মাথা কি খেয়েছো?’ ইত্যাদি বলা শুরু করলো। আমি বললাম-
-বল।
-তোমাদের কটা গাধা।
-চারটে।
-বকলস লাগবে পাঁচটা।
-পাঁচটা কি হবে?
-কখনও সখনও মানুষেরও বকলস লাগে। ঠান্ডা কন্ঠে
বলেছিল কুকুরসঙ্গী মহিলা।
অনেক
খোঁজাপাতি করে সেদিন পাঁচটা বকলস কিনে বাড়ি ফিরেছিলাম। গাধার গলায় বকলস দেখলে
লোকে হাসে, নিন্দে করে মন্দ বলে। বলে ‘ল্যাংবোটের আবার কেবিন।’
সে বলুক গে। ওসব নিয়ে ঘামাই
না। আমার গাধার গলায় আমি বকলস কেন, নেকলেসও পরাতে পারি। তোমরা বলার কে হে!
যমালয়।
আজ এখানে গাধাদের বিশেষ অধিবেশন। পৃথিবী থেকে সব মৃত গাধাদের নিয়ে আসা হয়েছে।
এখানে আসার পর তারা আবার জ্যান্ত গাধাতে পরিণত হয়েছে এবং নিজেদের মধ্যে খুনসুটি
করার চেষ্টা করছে। এক গাধা স্বামী-স্ত্রী,
পাঁচ বছর পরে তাদের মধ্যে দেখা:
গাধা: তুমি
কেমন আছ?
গাধী: তোমার বিরহে
কাতর (সামনের ছোকরা গাধাটা তাকাচ্ছে দেখ)
গাধা: তুমি
কি আবার কাউকে-
গাধী: তোমার
স্মৃতি- (সামনের ছোকরা আবার হাসছে। ছোকরাটাকে দেখতে ভালো। আমাদেরটার মতো
শ্যাওড়া গাছের পেত্নী নয়। ওকে আবার চোখ টিপে টিপে ইশারা করলো। বেশ খেলুড়ে।)
গাধা: আমার কথা
মনে পড়ে? (আরে পাশের গাধাটা তো বেশ খুবসুরৎ। আমার বিবির মতো ঢ্যাপস নয়)
গাধী: তা তো
পড়েই। বিয়ে করো সোয়ামী। কতদিন ঘর করেছি। কত মান অভিমান (ছোকরাটা সামনের দিকে
এগিয়ে যাওয়ার জন্য ইশারা করছে। মনে হয় কিছু বলতে চায়। কি বলতে চায়? যাবো নাকি
এগিয়ে? যাই।)
গাধী: তুমি দাঁড়াও,
আমি একটু আসছি।
গাধা: (বাঁচা
গেল। পাশের গাধীটা আমার দিকে এগিয়ে আসছে। আহা, পটলচেরা চোখ, বাঁশির মতো নাক।
পাটকেলের মতো রঙ। এমন গাধীর সঙ্গে প্রেম করতে পারলে প্রাণে প্রেম জাগে। দেব নাকি
প্রস্তাব। হাবভাব তো অনুকূল মনে হচ্ছে।)
গাধা: (গাধীর
পাশে গিয়ে)হাই।
গাধী: হ্যালো
গাধা: একা?
গাধী: দোকা আর
পেলাম কোথায়?
গাধা: খুঁজলেই
পাওয়া যায়।
গাধী: তার তো
আবার বউ আছে।
গাধা: পাঁচ বছর
আগে মরে যাওয়া বউ। সেই বিয়ে ডিসমিস। ডিভোর্স হয়ে গেছে।
গাধী: যদি
ঝামেলা করে-
গাধা: করবে না।
গাধী: কিসে
বুঝলে?
গাধা: ঐ দেখো, তিনি
এক ছোকরার সঙ্গে খিলখিল করে হাসছেন। মনে হয় চুলের মুঠি ধরে দিই দু’খানা।
গাধী: আমার
বেলা-ও তাই করবে নাকি!
গাধা: যদি
বেগড়বাই করো তবে-
গাধী: আর তুমি
যদি করো, এখন যেমন করছো।
গাধা: তোমাকে
পেলে আর কারো দিকে তাকাবোই না।
গাধী: দিব্যি?
গাধা: দিব্যি।
যে সব গাধারা পৃথিবী থেকে
এসেছিল, তারা তাদের পছন্দ মাফিক জীবনসঙ্গী খুঁজে নিতে পেরেছিল কি না সেটা অন্য প্রশ্ন। কিন্তু একটা প্রশ্নেরই নিশ্চিত
উত্তর এই অধিবেশনে মিলেছিল।
গাধারা বিয়ে করে কি না
প্রশ্ন করে যে বালকপুত্র বাবার হাতে চপেটাঘাত খেয়েছিল, তিনিই যমালয়ের এই সংস্থার
সচিব। ভাল বেতন পান। গাড়ি বাড়ি সব আছে। সারাদিনের অনুষ্ঠানের শেষে বাড়ি গিয়ে নিভৃত
স্থানে বসে চিন্তা-ভাবনা করে তিনি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন, কেবলমাত্র কিছু সংখ্যক
গাধাই প্রেম করে এবং বিয়ে করে।
লেখক পরিচিতি
ভীষ্মলোচন শর্মার পোশাকি নাম উৎপল মৈত্র। একদা দৈনিক বসুমতী কাগজে সাংবাদিক
ছিলেন। বর্তমানে ‘বইওয়ালা’ নামে একটি প্রকাশনা সংস্থার সাথে যুক্ত। স্থায়ী নিবাস
কলকাতায়।
