Advt

Advt

সুন্দর ও প্রগতিশীল দেশ - নরওয়ে (ভ্রমণ) - কর্ণেল (ডাঃ) প্রণবকুমার দত্ত, Sundar O Pragatishil Desh - Narway, Tatkhanik Bangla / Bengali Magazine Online Reading Free

 

সুন্দর ও প্রগতিশীল দেশ - নরওয়ে (ভ্রমণ) - কর্ণেল (ডাঃ) প্রণবকুমার দত্ত, Sundar O Pragatishil Desh - Narway, Tatkhanik Bangla / Bengali Magazine Online Reading Free

বেশ কয়েক বছর আগে একটা সুযোগ পেয়েছিলাম Scandanavia অঞ্চলের চারটে দেশ দেখার । সুযোগটা হাত ছাড়া করিনি । Nordic বা Scandanavia -র পাঁচটা দেশের মধ্যে আমি চারটে দেশ - অর্থাৎ নরওয়ে , সুইডেন , ডেনমার্ক এবং ফিনল্যান্ড দেখে এলাম । এই নিবন্ধে আমি নরওয়ে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সম্বন্ধে কিছু বলব । স্বল্প সময়ের জন্য দেশটার কয়েকটা জায়গা দেখা ছাড়া রাজধানী ওসলো এবং ওই দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর বারগেন - এ আমার যাবার সুযোগ হয়েছিল । তাছাড়া ওসলো থেকে বারগেনে পৃথিবীর উচ্চতম রেলভ্রমণের অভিজ্ঞতাটা আমার সারা জীবন মনে থাকবে ।

স্ক্যান্ডানেভিয়ার দেশগুলির মধ্যে আয়তনে নরওয়ে হোল তৃতীয় এবং লোকসংখ্যা হিসাবে দ্বিতীয় স্থানের অধিকারী । নরওয়ে ঘুরে মনে হয়েছে যে প্রকৃতি এই দেশটাকে খুব সুন্দরভাবে সাজিয়ে দিয়েছে - সেটা বরফাবৃত পাহাড়ই হোক বা মনোরম সমুদ্রতটই হোক - বিশেষত্ব হোল রুক্ষ খাড়া পাহাড় যেগুলির উচ্চতা ছয় / সাত হাজার ফিটের বেশি হবে না এবং তাদের মাঝে মধ্যে বয়ে চলেছে শয়ে শয়ে পাহাড়ী নদী বা খাঁড়ি । এগুলিকে নরোজিয়ান ভাষাতে Fjord বা ফিয়ার্ড বলে। পরিসংখ্যান হিসাবে নরওয়েতে বারশোটার মত খাঁড়ি বা পাহাড়ী নদী আছে । তাছাড়া কয়েকটা হ্রদ এবং হিমবাহও দেখলাম ।

নরওয়ের আয়তন হোল ৩,৮৫,২৫২ বর্গ কিলোমিটার এবং সর্বশেষ আদমসুমারী হিসাবে লোকসংখ্যা ছিল ৫,২৫,৩১৭ । রাজধানী ওসলো ছাড়াও বড় শহরগুলি হোল বারগেন এবং ট্রন্ডহ্যাম । এই দেশে শিক্ষার হার হোল এশ শতাংশ এবং মানুষের গড় আয়ু আশি বছর ।

নরওয়ে সুমেরুবৃত্ত বা Artic Circle এর কাছে অবস্থিত বলে এই দেশটা অত্যন্ত ঠান্ডা এবং বছরের বেশীরভাগ সময়ে ঝড়ো আবহাওয়া চলতে থাকে। সে সময়কার পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেখেছিলাম এই দেশের নব্বই শতাংশ লোক দেশের দক্ষিণ এবং পশ্চিম অঞ্চলে বসবাস করে । প্রচন্ড ঠান্ডা এবং ঝড়ো আবহাওয়ার জন্য দশ শতাংশের মত লোক শুধু উত্তর অঞ্চলে বাস করে।

কথিত আছে যে কয়েশো বছর আগে নরওয়ে এবং আশেপাশের দেশগুলিতে জলদস্যুদের উপদ্রব ছিলপ্রাচীণকালে এই দেশের বেশ কিছু যুবকদের এটাই ছিল পেশা । ১৯০৫ সালে নরওয়ে স্বাধীন হয় । বর্তমানে দেশে রাজতন্ত্র থাকলেও এই দেশের সংবিধান অনুসারে প্রতি ৬ বছরে দেশে নির্বাচন হয় । পার্লামেন্টের নির্ধারনের পর সরকার দেশ চালায়। ১৮১৪ সালে নরওয়েতে প্রথম সংবিধান বা কনস্টিটিউশন তৈরি হয় । এই দেশের পার্লামেন্টের নাম হোStorting! আমি যখন যাই সেসময় দেশের রাজা ছিলেন পঞ্চম হ্যারল্ড । ১৯৯৪ সালের গণভোটের পর নরওয়ে এখন আর ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সভ্য নেই । এই দেশের সমাজতন্ত্র অনুযায়ী নরওয়ে হোল ওয়েলফেয়ার স্টেট বা হিতসাধক রাষ্ট্র । এর উদ্দেশ্য হোল যে দেশের প্রত্যেক নাগরিকের সামাজিক এবং আর্থিক নিরাপত্তা থাকবে । অর্থাৎ প্রত্যেক দেশবাসী এখানে বিনামূল্যে স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং প্রয়োজনমত আর্থিক সহায়তা পাবে । দেশের প্রতিটি ছেলে - মেয়ে নিখর্চায় পড়াশুনা চালিয়ে যেতে পারবে - এমনকি উচ্চশিক্ষা বা পেশাদারী শিক্ষাও এর মধ্যে অন্তর্গত ।

এই দেশের অর্থনীতি প্রগতিশীল । সত্তর দশক থেকে পেট্রোল এবং প্রাকৃতিক গ্যাস পাবার ফলে দেশের অর্থনীতি উৰ্দ্ধগামী । ইউরোপের বেশ কয়েকটা দেশকে নরওয়ে পেট্রোল এবং গ্যাস সরবরাহ করে । জাহাজ নির্মাণের ক্ষেত্রে এই দেশ বিশ্বের চতুর্থ স্থানে রয়েছে । প্রাচীণকাল থেকেই এই দেশ মাছ ধরার জন্য বিখ্যাত । সেজন্য আজও নানা দেশে মাছ রপ্তানি করেও নরওয়ের প্রচুর আয় হয় । শ্রমশিল্প সক্রান্ত শিল্পজাত সামগ্রী উৎপাদনের জন্য এই দেশটা বিখ্যাত ।

উত্তর মেরুর কাছে নরওয়ের অবস্থান হওয়াতে এখানে গ্রীষাকালেও মধ্যরাতে সূৰ্য্য দেখা যায় । যে জন্য এই দেশটাকে বহু লোকে Land of Northern Light বা Midnight Sun বলে অভিহিত করে ।

ওসলো দেশের রাজধানী হলেও আধুনিক এবং প্রাচীণ ঐতিহ্যমন্ডিত শহর । এই শহরের প্রাকৃতিক দৃশ্য অতি মনোরম । ওসলো দেশের পঞ্চম বৃহত্তম খাড়ি বা নদী অসলোফিড - এর তীরে অবস্থিত। আমাদের গাইড বলেছিল যে পর্যটকরা যখন সমুদ্রগামী জাহাজে করে ওসলো বেড়াতে আসে , তাদের অপূর্ব অভিজ্ঞতা হয় । কারণ জাহাজটা যখন বন্দরে প্রবেশ করে তখন শহরটাকে ছবির মত দেখায় । শহরের বিখ্যাত স্থানগুলি যেমন রাজপ্রাসাদ , পার্লামেন্ট হাউস , অপেরা হাউস ইত্যাদি জাহাজ থেকে দেখতে খুবই সুন্দর লাগে । এই নদীটা ছাড়া ওসলো শহরটা ছোট ছোট পাহাড় এবং ঘন জঙ্গল দিয়ে ঘেরা । বর্তমানে নদীর পাড়ে ছোট ছোট শহরতলী গড়ে উঠেছে আর সেজন্য কয়েক বছর পরপরই দিগন্তরেখা বা Sky Line বদলে যায় । আমরা যখন গিয়েছিলাম সেসময় ওই শহরের জনসংখ্যা ছিল ছয় লক্ষ ত্রিশ হাজারের একটু বেশি । গবেষকরা মনে করেছিলেন যে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এটা দশ লক্ষতে পৌঁছাবে । ওসলো শহরের দর্শনীয় স্থানগুলি দেখতে আমরা প্রথম গেলাম স্কি জাম্পিং পাহাড়ে । এই জায়গাটার নাম হোহোলম্যান কলব্যকেন আর পাহাড়টার নাম হোল ভিকারসেন্ড । এই পাহাড়ের উপর থেকে সমস্ত শহরটার সমুদ্রতট , নদী এবং আশেপাশের পাহাড়গুলির অপূর্ব দৃশ্য দেখলাম । এখানে ২০১১ সালে বিশ্ব শীতকালীন ক্রীড়ার আয়োজন হয়েছিল । অদূর ভবিষ্যতে এখানে উইন্টার অলিম্পিক গেমস হবার কথা । বিশেষজ্ঞরা মনে করে যে এটা বিশ্বের সব থেকে সেরা জাম্পিং টপ । এখানে প্রায় একশ ফুট উঁচু থেকে প্রতিযোগীরা স্কি করে নীচের বরফের উপর থেকে লাফিয়ে নীচে চলে আসে । নীচে একটা এ্যম্পিথিয়েটারের মত আছে যেখানে প্রায় এক হাজারের মত দর্শক বসতে পারে । ২৯ শে ফেব্রুয়ারী ২০১৫ সালে এ্যান্ডুস ফ্যান্ডেল বলে এক যুবক এখানে ৮২৫ ফুট ঝাঁপ দিয়ে বিশ্ব রেকর্ড করেছিল। একটা সংলগ্ন মিউজিয়াম আছে । সময়ের অভাবে আমরা সেটা দেখতে যেতে পারিনি।

এরপরে আমরা গেলাম সিটি হলে । এই বিল্ডিং - এর সামনে দুটো টাওয়ার আছে - এগুলির উচ্চতা ষাট ফুটের একটু বেশি । Town Hall (বা সিটি হল ) এর সামনে ফোয়ারা আছে । এই হলে সাধারণতঃ রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক নেতাদের মিটিং হয় । আমাদের সবার জানা বা নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয় স্টকলোমে । সেখানে সাধারণত চারটে বিষয়ে পুরস্কার দেওয়া হয়ে থাকে- যথাক্রমে পদার্থ বিদ্যা ( Physics ) , রসায়ন বিদ্যা ( Chemistry ) , ভেষজবিদ্যা (Medicine ) এবং সাহিত্য বা Literature - এ নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয় । তাছাড়া বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য যে নোবেল পুরস্কারটি দেওয়া হয় সেটা দেওয়া হয় ওসলোতে । প্রতি বছর ১০ ই এবং ১১ ই ডিসেম্বর এখানে সাধারণত নরওয়ের রাজা প্রাপকদের পুরস্কার প্রদান করে। এখানে সব পুরস্কার প্রাপকদের ছবি দেওয়ালে টাঙ্গান আছে । আমরা ভারতীয়রা প্রাপকদের মধ্যে কৈলাশ সত্যার্থী এবং পাকিস্তানের ইউসুফ মাললীর ছবি দেখলাম । পুরস্কারের দিনে একটা কনসার্ট এবং ডিনারের পর অনুষ্ঠানের সমাপ্তি হয় । অনুষ্ঠানে প্রায় এক হাজার লোক নিমন্ত্রিত হয় ।

সিটি হল ছাড়াও আমরা গেলাম রাজপ্রাসাদ ,পার্লামেন্ট হাউস ও অপেরা হাউস দেখতে। অপেরা হাউসটা নদীর পারে অবস্থিত এবং এখানে দর্শকরা হেঁটে ছাদে উঠতে পারে ।

নরওয়ের সংস্কৃতি এদেশের সম্পদ । বিখ্যাত নাট্যকার হেনরি ইবসেনের নাম সবার জানা । এ দেশের চারজন বিখ্যাত লেখক সাহিত্যের জন্য নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন ।

পর্যটকদের জন্য সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হল ভিজেল্যান্ড উদ্যান এবং সংলগ্ন সংগ্রহশালা । এই দেশের পর্যটন বিভাগের পরিসংখ্যান হিসাবে এই পার্কে প্রতি বছর দশ লক্ষ লোক বেড়াতে আসে । উদ্যানে ২০০ - টার মত ভাস্কর্য আছে যেগুলি ব্রোঞ্জ , গ্রানাইট এবং ঢালাই করা লোহার তৈরি । ভাস্কর গুস্তাভ ভিজেল্যান্ড ( ১৮৬৯-১৯৪৩ ) পরিকল্পনা করে সব নিজের হাতে এই মূর্তিগুলি তৈরি করেছিল । এই উদ্যানে সর্বসাকুল্যে ১৯২ টা মূর্তি আছে। সবকটা মূর্তি মানবজীবনের নানা স্তরের প্রতীক । মূর্তিগুলি আবাল বৃদ্ধবণিতাদের কৌতুহল বাড়িয়ে দেয় । পার্কের সবথেকে উঁচু জায়গাতে ১৭ মিটার লম্বা একটা পিলারের উপরে ১২১ জন মানুষের প্রতীক আছে আর তাতে একটা মানুষের উপর আরেকটা মানুষের মূর্তি বানান হয়েছে । এইটার নাম দেওয়া হয়েছে Mowlott.উদ্যানের সবথেকে বড় আকর্ষণ হোল একটা রাগী বছর পাঁচেকের ছেলের কান্নার মূর্তি। এই মূর্তিটার নাম দেওয়া হয়েছে Angry Young Boy এই মূর্তিটা অসাধারণ জনপ্রিয় আর এর নাম হোল সিনাটগ্রেন ।

এরপর আমরা গেলাম Viking Museurm- এ । এটা হোল জলদস্যুদের জাহাজের সংগ্রহালয় । আমাদের গাইড বলল যে এ শহরে প্রায় চল্লিশটার মত মিউজিয়াম আছে । তারমধ্যে Viking Museum হোল বিখ্যাত । এই সংগ্রহশালায় পুরান দিনের ব্যবহৃত গোটা তিনেক জাহাজ রাখা আছে । ঢুকলেই দেখা যায় ওসবার্গ জাহাজটা । কথিত আছে যে এই জাহাজটা বানান হয়েছিল ৮২০ খৃষ্টাব্দে । আমাদের গাইড জানাল যে দুজন প্রভাবশালী মহিলার জন্য এই জাহাজটা বানান হয়েছিল এবং যাত্রার আগে তাদের নানা সখের জিনিস উপহার দেওয়া হয়েছিল ।

দ্বিতীয় প্রদর্শিত জাহাজটার নাম হোল গোকবাড ( Gokstand ) এটা আরো ৭০ বছর পরে বানান হয়েছিল অর্থাৎ ৮৯০ খৃষ্টাব্দে কোন একজন প্রভাবশালী ব্যক্তির জন্য । এই জাহাজটা দূরে গভীর সমুদ্রে পাড়ি দিয়েছিল । ওই জাহাজে ১২ টা ঘোড়া , ৮ টা কুকুর এবং দুটা ময়ুর ছিল । ওই সমাহিত জাহাজ থেকে অশ্বাদি পশুর সাজ পরে উদ্ধার করা হয়েছিল ।

তৃতীয় প্রদর্শিত জাহাজের নাম Tune এর আবির্ভাব হয়েছিল ১৮৭৬ সালে । গবেষকদের মতে এই জাহাজটা জলদস্যুরা ব্যবহার করত। এই জাহাজের ধ্বংসাবশেষের মধ্যে পুরান অস্ত্রশস্ত্র এবং ঘোড়ার কঙ্কাল পাওয়া গেছিল । অনেক গবেষকদের মতে যে সমুদ্র গর্ভে জাহাজগুলকে সমাহিত করা হয়েছিল - সেটাকে অনেকে Burial Chamber বলে অভিহিত করে ।

পরের দিন আমরা ওসলো থেকে ৮০ কি.মি. পশ্চিমে গেলো বলে একটা ছোট শহরে পৌছালাম । গেলো নরওয়ের একটা বিখ্যাত Ski Resort শুনলাম যে শীতকালে স্কি করার জন্য এখানে প্রচুর লোক আসে । ইউরোপের সর্বোচ্চ এবং সুবিন্যস্ত রেলপথ হল বার্গেন রেলওয়ে । এই রেলভ্রমণ আরম্ভ হয় ওসলো থেকে এবং ঘন্টা সাত পরে বার্গেন গিয়ে পৌঁছায় । গেলো হোল এই রুটে একটা মধ্যবর্তী রেল স্টেশন এবং এখান থেকে আরো চারটে স্টেশনের পরে হোল মিরডেল জংশন । গেলো এবং মিরডেলের মধ্যে দুপাশের দৃশ্য অত্যন্ত মনোরম । রেল চলছে দুই থেকে আড়াই হাজার ফুট উচ্চতায় এবং রাস্তার দুপাশে দেখা যায় ছোট ছোট পাহাড় , হিমবাহ এবং কয়েকটা হ্রদ । মাঝে মাঝে পাহাড়ী নদী ( বা ফিয়ার্ড ) ও চোখে পড়ে । গ্রীষ্ণকালেও আমরা হাল্কা তুষারপাতও দেখেছি । মিরডেল রেল স্টেশনটা সমুদ্রতল থেকে ২৬০০ ফুট উঁচুতে অবস্থিত । Myrdal -এর আগের স্টেশন থেকে দূরে হ্যালেন ফোর্ড নামক জাতীয় উদ্যানটি দেখা যায় । শোনা গেল যে এখানে বলগা হরিণের দেখা পাওয়া যায় । কিন্তু ঘন কুয়াশার জন্য আমরা কোন জন্তু জানোয়ারই দেখিনি । এই এক ঘন্টার রেল ভ্রমণে আমাদের ৩ / ৪ তি সুরঙ্গ বা (Tunnel) পেরোতে হয়েছে । শুনলাম যে ফিনসে স্টেশনে পৌঁছানার আগে একটা সতেরশ ফুট লম্বা সুরঙ্গের দেখা মেলে । ওটা বানাতে দশ বছর সময় লেগেছিল ।

মিরডেল জংশন থেকে আমরা ছোট লাইনের রেলে করে ফ্ল্যাম ( Flam ) বলে একটি স্টেশনের অভিমুখে গেলাম । মিরডেল এবং ফ্ল্যামের মধ্যে ছটা স্টেশন আছে । ওটা একটা Toy Train এবং আস্তে আস্তে সমতল ভূমিতে পৌঁছায় ( যেখানে ফ্ল্যাম স্টেশন অবস্থিত ) এবং আস্তে আস্তে নামতে শুরু করে । এই ভ্রমণটা মনে রাখার মত । যেমন সুন্দর ট্রেনের বগিগুলি তেমন সুন্দর রাস্তার দুপাশের প্রাকৃতিক দৃশ্য । আমার নিজের কালকা সিমলা বা নিউ জলপাইগুড়ি থেকে দার্জিলিং - এ টয় ট্রেনে যাবার অভিজ্ঞতা আছে । কিন্তু এই রেলপথ অর্থাৎ মিরডেল থেকে ফ্ল্যাম পর্যন্ত রেলভ্রমণের অভিজ্ঞতা আমি জীবনে ভুলতে পারব না । ছোট ছোট পাহাড়ের মধ্যে দিয়ে ট্রেনটা চলেছিল । খুব আস্তে আস্তে নামছিল । রাস্তায় বেশ কয়েকটা জলপ্রপাত বা ( cascade) ছিল যেখানে উদ্দাম জলধারা ট্রেন লাইনের পঞ্চাশ গজের মধ্যে আছড়ে পড়ছে । মনে হয় যেন হাত বাড়ালেই জলের ধারা আমাদের হাতে এসে পড়বে । আগেই বলেছি যে ফ্ল্যাম স্টেশনটা সমতল ভূমিতে অবস্থিত এবং স্টেশন থেকে দু'শ গজের মধ্যেই শুরু হোল একটা খাঁড়ি বা পাহাড়ী নদী । এটার নাম Arrangfiord বা ঔরাঙ্গ নদী । ঐ নদীতে আমাদের এক ঘন্টার জন্য ক্রুজের ব্যবস্থা ছিল । জাহাজটা আমাদের সমুদ্রের মোহনা থেকে ঘুরিয়ে আনল । সেখানে ঘন নীল জল এবং দুপাশে খাড়া পাহাড় । Myrdal -এ ফিরে এসে বাস ধরলাম এবং বাস চলল বার্গেন অভিমুখে । গেলো থেকে মিরডেল যাবার ট্রেনের রঙটা ছিল গাঢ় লাল এবং মিরডেল থেকে ফ্ল্যামের যাবার ট্রেনটার রং ঘন সবুজ । গাইড আমাদের বলল যে বার্গেন রেলওয়ে বানানোটা রেলের ইঞ্জিনিয়ারদের জন্য একটা বিরাট চ্যালেঞ্জ ছিল । শুনেছি যে এই রেলপথে ভ্রমণের আনন্দ উপভোগ করতে ইউরোপের নানা দেশ থেকে হাজার হাজার পর্যটকরা ভ্রমণ করতে আসেন প্রাকৃতিক দৃশ্য উপভোগ করতে ।

আগেই বলেছি যে বার্গেন হোল এই দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর এবং পশ্চিম নরওয়ে প্রদেশের রাজধানী । শহরটা সমুদ্রের পশ্চিম উপকূলে অবস্থিত । এই শহরের চার দিকে শুধু উঁচু পাহাড় দেখা যায় । এই পাহাড়গুলি বিভিন্ন উচ্চতায় কাঠের বাড়িগুলিকে দূর থেকে খুব সুন্দর দেখায় । এই শহরের জনসংখ্যা সেসময় ছিল,৭৫,০০০ - এর মত । এখানে মাছের বড় বাজার আছে এবং এখান থেকে ইউরোপের নানা দেশে মাছ রপ্তানী করা হয় ।

বার্গেন পর্যটকদের খুব প্রিয় জায়গা । পৃথিবীর নানা দেশ থেকে এখানে ক্রুজে হাজার ভ্রমণকারীরা বেড়াতে আসে । এই শহর হাজার বছরের পুরানো এবং কিছুদিন আগে পর্যন্ত বার্গেন Scandanavia -র সবথেকে বড় শহর বলে পরিগণিত হোত । ওসলোর তুলনায় এখানে বছরে তিনগুণ বৃষ্টিপাত হয় । বার্গেন থেকে পর্যটকরা ক্রুজে দেশের উত্তর প্রান্তে কারসিন শহরে বেড়াতে যায়। তার কারণ নরওয়েতে যত উত্তরাভিমুখে যাওয়া যায় সেখানে মধ্যরাতের সূর্য বা উত্তরের আলো দেখার অভিজ্ঞতা বেশী সঞ্চয় করা যায় । এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য UNESCO নরওয়েকে World Heritage Site এর মর্যাদা দিয়েছে ।

বার্গেন শহরের প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখার জন্য এক প্রান্তে ছোট পাহাড় Mount Floyan -এর উপরে Funicular Train- এ করে ঐ পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছাতে হয় । উপর থেকে শহরটাকে খুব সুন্দর লাগে । এই অভিজ্ঞতাও অসাধারণ । সন্ধাবেলা আমরা বার্গেন থেকে প্লেনে করে চলে গেলাম ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহ্যগনে ।

পরিশেষে বলব যে যে ৪ / ৫ টা দেশ দেখলাম সব কটা জায়গার প্রাকৃতিক দৃশ্য অত্যন্ত সুন্দর । ওসলো শহরটা ছবির মত সাজানো । পরে বাৰ্গেনে এসে মনে হয়েছে যে এটা ওসলোর থেকেও সুন্দর । বাৰ্গেনে আসার জন্য রেলভ্রমণ এক নতুন অভিজ্ঞতা হোল । আমারে নিজের সুইডেন বা ডেনমার্কের থেকে নরওয়ের প্রাকৃতিক দৃশ্য আরো চিত্তাকর্ষক বলে মনে হয়েছে । সবথেকে ভাল লেগেছে পাহাড়ী নদীগুলিতে ক্রুজ করা । চোখ বুজলে চোখের সামনে ভেসে ওঠে , বার্গেন শহরের সমুদ্রতট । সারি সারি কাঠের বাড়িগুলি দেখতে চমৎকার লেগেছিল । সময়ের অভাবে আমাদের নরওয়ের উত্তরাংশে গিয়ে মধ্যরাতের সূৰ্য্য বা উত্তরের আলো দেখার সুযোগ হয়নি । ভবিষ্যতের জন্য এটা তোলা আছে। ---

লেখক পরিচিতি -  

প্রণব কুমার দত্তর জন্ম কলকাতায় ১৯৩৬ সালে। পেশায় চিকিৎসক এবং পঞ্চাশ বছরের বেশী জনস্বাস্থ্য বিজ্ঞানের (বা Public Healthবিশেষজ্ঞ। স্নাতকোত্তর প্রথম ডিগ্রী ১৯৬৬ সালে এবং পরবর্তীকালে জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৮১ সালে পি.এইচ.ডি.। ত্রিশ বছরের বেশী আর্মিতে চাকরীর সুবাদে ভারতবর্ষের নানা জায়গা দেখার সুযোগ ঘটেছে। পুনায় আর্মড ফোর্সেস মেডিকেল কলেজে (AFMC)-এ পাঁচ বছর শিক্ষক ছিলেন। পরবর্তীকালে ইন্দিরা গান্ধী মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় এবং ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ হেলথ এন্ড ফ্যামেলি ওয়েলফেয়ারের (NIHFW) সঙ্গে শিক্ষকতা এবং স্বাস্থ্য গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ওঁর লেখা দুটো বই ছাড়াও নব্বইটির বেশী বিজ্ঞান ভিত্তিক লেখা দেশে ও বিদেশের জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। প্রথম বাংলা সংকলন কর্নেলের ডায়রী” ১৯৯৪ সালে প্রকাশিত হয়।  ৬০-টি বেশী ভ্রমণ কাহিনীছোট গল্প এবং প্রবন্ধ নানা লিটল ম্যাগাজিনে ছাপা হয়েছে।