Advt

Advt

chotan-master-story-galpo-by-dr.shibshankar-pal-tatkhanik-digital-bengali-web-bangla-online-e-magazine-ছোটন-মাস্টার-গল্প-ড.শিবশঙ্কর-পাল

chotan-master-story-galpo-by-dr.shibshankar-pal-tatkhanik-digital-bengali-web-bangla-online-e-magazine-ছোটন-মাস্টার-গল্প-ড.শিবশঙ্কর-পাল
 

ঘড়িতে তখন ১১টা বেজে ২০ মিনিট বাইকটা গেটের সামনে রেখে ছোটন হাঁক দিল— ‘কই রে দেব? চাবিটা নিয়ে আয়স্কুল লাগোয়া দেব-এর বাড়ি ওদের বাড়িতে স্কুলের চাবি থাকে এমনিতে একটু দেরি হয়েছে মাস্টারের আর স্কুলের মুখে এসে পড়লে ছটফটানিটা বোধ হয় আরেকটু বেশিই হয়ে যায় কি করবে ভেবে না পেয়ে মাস্টার শুরু করল পায়চারি খামখা স্কুলের ফাটা দেওয়ালগুলো দেখতে দেখতে ভাবল, ওগুলো জলদি সারানো দরকার৷ চুনকামটা না করলেই নয় গ্রিলগুলো মরচে ধরে দাঁত ভ্যাঙাচ্ছে ট্যাপকলটা ঘাড় বাঁকিয়ে বহুদিন ধরে অকেজো এত এত কাজ বাকি! এগুলোর দিকে তো খেয়ালই করা হয়নি! ভিতরের তাড়াহুড়োটা যেন আরও বেড়ে গেল মাস্টারের যদি এস.আই. এসে পড়েন তাহলে আর নিস্তার থাকবে না এসব চিন্তা যখন কটকট করে বুকের ভিতরটাকে মোচড়াচ্ছে, তখন ল্যাংটা হয়ে সামনে এসে দাঁড়ালদেব গোটা গায়ে ধুলো, শীতের আবহে হাতে-পায়ে খড়ি উঠছে ছেলেটার একগোছা চাবি মাস্টারের দিকে এগিয়ে দিয়ে ছেলেটি আবার একছুটে উধাও স্কুলের গেট খুলে তাড়াতাড়ি হাজিরা খাতাটা বার করে বাইরে বসল ছোটনখচখচ করে গোটা চারপাঁচেক সই নিল সেরে লকডাউনের জেরে স্কুলের  অধিকাংশ কাজ এখন বাড়িতে বসে হয় স্কুলে এসে হাতে তেমন কাজও থাকে না শুধুমাত্র স্কুলের সাংগঠনিক কাজ যদি কিছু থাকে, সেসব বাদ দিলে উঠে-বসে ঘন্টা কয়েক সময় কাটালেই হয় এই হয়েছে করোনার একপ্রকার আশীর্বাদ! ছাত্র নেই, ক্লাস নেই, প্রতিদিন মিড-ডে মিল নেই, ডেলি চেক আপের খাতাও নেই সুতরাং স্কুলের নামে এটা একপ্রকার ছুটি কাটাতে আসার জায়গা বলা যেতে পারে বাড়ি থেকে ভাত খেয়ে এসে, স্কুলের পিছনে গিয়ে গোটা দুয়েক সিগারেট টেনে, মাঝে দেবাংশীদের বাড়ি থেকে আসা চা খেয়েস্কুলে সময় কাটানো তো একপ্রকার ছুটিই! শীতের রোদে চেয়ারটা টেনে নিয়ে মোজ হয়ে বসে থাকল ছোটন ঘুম আসে না তবুও মিষ্টি রোদে বসে বসে পা দোলানোটা সত্যি বিনোদনের ব্যাপার ঠিক মাসটি পুজলে হাতে গরম মাইনা দিব্যি জুটছে স্কুলের পাশ দিয়ে চলে যাওয়া এক দুজন অভিভাবক হয়তো বলে— ‘মাস্টারদের মজা কাজও নেই আবার মাইনাটিও পাচ্ছে কী বলো ছোটন?’ এরকম প্রশ্নে ছোটন বিব্রত বোধ করে কথাটা তো খুব খারাপ নয় শুধু শুধু কাঁড়ি কাঁড়ি টাকাগুলো সরকার শিক্ষকদের দিচ্ছে কিন্তু শিক্ষক সমাজের কোন হেলদোল নেই এতে অনন্ত একটা মাস্টারকেও সে বলতে শোনেনি, যে বলেছে আমাদের মাইনে আপাতত কমানো হোক এমনকি এসব কথা বলার সাহস তারও হয় নি বরং সে ভেবেছে, সে নিজেই স্কুলের বেশ কিছু টাকা খরচ করে ফেলেছে চুনকাম করার জন্য যে দশহাজার টাকা সে উইথড্র করেছে, সেটাও সে ভেঙে ফেলেছে এর ভরপাই সে নিজেই দেবে এটা ঠিক কিন্তু করোনার আবহে ওই ক্ষতিপূরণ দেবার তাড়াও আপাতত নেই রয়ে বসে কাজটা তুলে দিলেই হলো স্কুলের ক্যাশবুকে যতই টাকা তোলার তারিখ দেওয়া থাক, সে টাকা উইথড্রর তারিখের পরে খরচ করলে অসুবিধা হয়না এরকম সে বহু করেছে, দশবছর TIC চালানোর অভিজ্ঞতা আছে যে তার ডানে-বায়ে হিসাব মিললেই হলো স্কুল লেবেল কমিটির মানুষগুলো খরচের হিসাব দেখে, তারিখ নিয়ে ওরা অত মাথা ঘামায় না সুতরাং এ-দিকটা নিয়ে ছোটন নিশ্চিন্ত থাকে আর ওই অভিভাবকদের প্রশ্নের উত্তরে শুধু একটু মুচকি হাসে ছোটন এভাবে বসে থেকে থেকে যদি একদুটো  ছাত্রছাত্রী স্কুলের পাশ দিয়ে যায়, ছোটন তাদের প্রায় জোর করে ধরে নিয়ে আসে যদিও প্রাথমিক স্কুলে ছাত্রদের একেবারেই আসা বাড়ন, তবুও ওসব ধর্তব্যের মধ্যে আনে না মাস্টার ভাবে একটু থাকুক ওরা দুটো কথা বলা যাবে ওদের অদ্ভত উদ্ভট কথা শুনে মনের সব বিষাদ লহমায় উড়ে যাবে  যতই করোনাবিধি আমরা কাগজে কলমে মেনে চলি না কেন, ঘরের মধ্যে আমরা সবাই তো একসঙ্গে থাকছি আর স্থানটা যদি স্কুল হয়, হলেই সব দোষ? ছেলেপুলে ছাড়া মাস্টার অকেজো তাছাড়া ছোটনের বয়স খুব একটা বেশী নয় যে, তাকে সব নিয়মকানুন ডাক্তারি প্রেসক্রিপশনের মতো মেনে চলতে হবেএকা একা স্কুলে থেকে ছোটন তাই মাঝে মাঝে বিরক্ত হয়ে ওঠে যেখানে আগে ছেলেদের পিছনে চিলচিৎকার করতে হতো, ‘ওরে থাম রে থাম রেবলে চিল্লাতে হতো, বিচারকের মতো ছাত্রছাত্রীদের বইয়ের পাতা ছেড়া থেকে জুতো হারানোর বিচার করে দিতে হতো— সেসব দিনকে খুব মিস করে ছোটন এক টাকার একটা চকলেটের বিনিময়ে কোটি টাকার নিষ্পাপ হাসি বাচ্চাদের মুখে দেখতে পেত প্রাক প্রাথমিকের ছাত্রদের চিপে ধরে আদর করার সময় যে মিষ্টি গন্ধে ছোটন বিভোর হয়ে থাকত, কচিকচি মুখ  নামতা পড় যার মন্ত্র উচ্চারণ মনে হতোসেই ছোটনের কাছে স্কুলকে এখন পরিত্যক্ত বাড়ি মনে হয় জানলা কপাট খুলে বসে থাকলে মনে হয় ক্ষুধিত পাষাণের প্রাসাদে চলে এসেছে সে দেওয়ালে বাচ্চাদের মাথার তেলচিটে দাগগুলো দেখলেও তার কষ্ট হয় ওই সব দাগের প্রায় প্রতিটি তার চেনা কোনটা দেবনাথের, কোনটা মন্দিরার আর একেবারে কোণারটা বীরুকুমারের দরজার ভাঙা কোণাটা দেখে তার মনে পড়ে দৌড়ে স্কুল ঢুকতে গিয়ে ওটাতে  দাঁত ভেঙেছিল চতুর্থ শ্রেণীর আকাশ লেট তারপর কী কাণ্ডটাই না হয়েছিল সে রক্ত থামেই না ওই দাঁত ভাঙার কারনে পেঁজাপেঁজা লালতুলোগুলো এখনও মনে হয় এখানে ওখানে ছড়িয়ে আছে এসব ভাবতে ভাবতে আবেগে বা কখনও রোমাঞ্চে ছোটনের সময় কেটে যায় মনে মনে সে ভাবে মাস্টারদের এই ভিতরের দিকগুলো কেউ দেখে না তারা ভাবে না বাগানে ফুল না থাকলে, সব থেকে বেশি কষ্ট হয় মালির ভাবেনা, আলো পোহানোর লোক না থাকলে, প্রদীপের জ্বলে থাকাটা শুধু তেলের অপচয় এভাবে প্রতিদিন স্কুল এসে শীতের রোদ পোহানোর আমেজ নিতে নিতে ছোটনের নিজেকে বড্ড বেশী একা মনে হয় মাস মাইনের টাকা নেওয়াটা বদহজমের সৃষ্টি করে খুব পরিষ্কার করে বললে নিজেকে যুগপৎ অসহায় ও বেহায়া মনে হয় সরকারকে মাইনা না নেওয়ার একটা আর্জিও সে জানাতে পারে না, আবার ছেলেদেরও পায় না কাছে মাঝে মাঝে বেপরোয়া হতে ইচ্ছে করে তার ইচ্ছে করে পাড়ায় পাড়ায় গিয়ে সবাইকে একসঙ্গে নিয়ে সেই কোদাল চালা গানটা ধরে, কানামাছি ভোঁ ভোঁ খেলা খেলে কানামাছি খেলার কথা মনে পড়লে তার মনে হয়, গোটা পৃথিবী এখন কানামাছি কানামাছি খেলছে কাকে সঠিক করে ছোঁবে সেটা অন্ধ পৃথিবী এখনও ভেবে পাচ্ছে না কোন কাপড়ে চোখমুখ ঢাকলে সত্যি নিজেকে বাঁচানো যাবে, তার কূলকিনারা পাচ্ছে না গোটা বিশ্বময় এখন ধোঁয়াশা, অন্ধকারে তীর চালানোর মতো চলছে নানারকমের পরীক্ষামূলক খেলা কাকে সঠিক করে ধরলে কানামাছির অন্ধত্ব দূর হবে সেটাও ভেবে পাচ্ছে না গোটা পৃথিবী হায় করোনা! তোমার নিরাময়ের নিমিত্ত আমরা আজ সবাই কানামাছি খেলছি এসব চিন্তার অতলে ছোটন ডুবে গিয়েছিল এটা তন্দ্রা? না মনের অবচেতন স্বপ্নকিছু বুঝে উঠতে পারে না মাস্টার হঠাৎ শরীরী ঝাঁকুনিতে তার চেতনা ফেরে দেব কখন এসে মাস্টারকে ঝাঁকাচ্ছে, সেটা ছোটন অনেকক্ষণ পরে টের পায়কী রে কি বলছিসবলে দেবের গালটা একটু চিপে দেয় মাস্টার কচিগুলো ভালবাসা বোঝেকতদিন তারা স্যারের কাছে আদর পায়নি, কতদিন তারা দু’টুকরো কেক পায়নি! ফিক করে একফালি হেসে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে দেব হয়তো সে একটি চকলেটের আশা নিয়ে অনেকক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে ছিল চটজলদি পকেটে হাত ঢুকিয়ে ছোটন দেখে পকেট শূন্য তাড়াহুড়তে চকলেট আনতে বেমালুম ভুলেছে সে প্রতিদিন সে দেবের জন্য কয়েকটা চকলেট আনে বাড়ির কোলে স্কুল হওয়াই এটা এখন দেবের নিত্য পাওনা হয়ে উঠেছে কিন্তু আজ স্যারের দেরি হওয়াতে সে বুঝতে পারে চকলেট নেই দৌড়ে যেই পালাতে যায় ছোটন তাকে জাপ্টে ধরে দেবের গায়ের একটু নরম ছোঁয়া নেওয়ার জন্য খুনসুটি করতে থাকে ছোটন কিন্তু আজ দেব ধরা দেবে না, তার মাস্টার যে কথা খেলাপ করেছে! দেবের মনের ভাব বুঝতে পারে ছোটন ছোটদের নরম মন নিয়েই ওদের কারবার তাই এই ক্ষুদে চকলেট প্রার্থীটিকে আশ্বস্ত করতে বলে— ‘কাল তোমাকে চারটে কাঠিলাগা চকলেট এনে দেবো, বুঝলে দেববাবুস্যারের কথা শুনে দিগম্বর দেবের গালদুটো ফুলে উঠল, চোখদুটোতে আশার আলো অব্যক্তরূপে খিলখিলিয়ে উঠল ছোটন ভাবে, হায় রে দেবশিশু কত অল্পে, কত সহজে তোরা তৃপ্ত হোস এই স্বল্প চাওয়াতে যদি সকলের বৃহৎ প্রাপ্তির আনন্দ থাকত, তাহলে জীবনযাপনের সমীকরণ কতই না সহজ হতো! কতো সহজে আমরা তোদের মতো দুশ্চিন্তাহীন, অনিদ্রাহীন শান্তির দেবলোকে পৌঁছাতে পারতাম!

ঘড়িতে তখন ১টা বেজে ৩৫ মিনিট রোদে ঝিমোতে ঝিমোতে সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে ছোটন ভুলে গিয়েছিল চা খেতে চা-খোরদের দলে ছোটনকে অনায়াসে ফেলা যায় ভাতের আগে পরেও চা হলে ওর না নেই স্কুলে চা করার রেওয়াজ বহু আগে হারিয়ে গিয়েছে স্কুল লাগোয়া দেবাংশী বাড়িটি সেই কবে ছোটনকে বলেছিল— ‘তুমি তো ঘরের ছেলে, তোমাকে এককাপ চাও খাওয়াতে পারব না?’ সেই থেকে প্রায় ১৪ বছর ধরে দেবাংশী বাড়ির চা খায় ছোটন আর মাঝে মাঝে ইয়ার্কি মেরে বলে— ‘আপনাদের চায়ে যা মিষ্টি, সুগার হলে ওষুধ কেনার পয়সাটাও দিতে হবে কিন্তুআসলে গ্রামের স্কুলে এগুলো ভালবাসার বন্ধন মাস্টারকে তারা গ্রামের ছেলে, ঘরের ছেলের চোখে দেখে এমনকি গ্রাম্য অশান্তির মীমাংসা, পারিবারিক কলহ মেটাতে মাস্টারদের বাড়ি বাড়ি যেতে হয় এভাবেই দীর্ঘ সময় পর স্কুলচত্বর, স্কুলের গেট পেরিয়ে গোটা গ্রামের আনাচে কানাচে পৌঁছে যায় গোটা গ্রাম, তার মানুষজন, সবাই এক চক্রে আবদ্ধ হয় মাঝে মাঝে স্কুলের সঙ্গে টুকরো বিবাদ ঘটলেও তার রেশ বেশিদূর গড়ায় না ছোটন সবাইকে কেমনভাবে যেন আপন করে নেয় সেই মানুষজন তখন মাস্টারদের ঢাল হয়ে ওঠে এই তো লকডাউন হবার কয়েকমাস আগে ছোটনকে সন্দীপ কীভাবে বাঁচিয়েছিল, সেটাও একটা গল্প সেদিন স্কুলেই আসেনি ছোটন সহকার নিমাই মাস্টার স্কুল খুলে ঘণ্টা খানেক পরে চলে গেলেন ঠিক তার আদা ঘণ্টা পরে এস.আই-এর গাড়ি হনহন করে ঢুকল স্কুলের সামনে গেটে ঝুলছে মোটা এলটা তালা মিড-ডে-মিলের ধোঁয়ার নামো নিশান নেই ধারেকাছে স্কুলখোলার কোন চিহ্ন সাহেব দেখতে পেলেন না গাড়িটাকে দূর থেকে সন্দীপ লক্ষ্য করেছিল কিন্তু স্কুলে যে মাস্টার নেই সেটা সন্দীপ জানত না স্কুলের সামনে ওই সাহেবকে অনেকক্ষণ ধরে কি সব লিখতে ব্যস্ত দেখে, সে ভেবেছিল হয়তো ভোটার লিস্টে নাম তোলার লোক এরা নেহাত তার বয়সটা সে-বছর ১৮ পুজেছে, তাই সে নাম তোলার খোঁজ খবর নিতে এসে বুঝতে পারে ডালমে কুছ কালা হেই কাছে এসে বুঝতে পারে, আজ স্যারের কপালে বাঘ পড়েছে সাহেবকে সন্দীপ কী জানি কেন আন্দাজে গুল মেরে বলেছিল এই তো সে ছোটন স্যারকে কিছুক্ষণ আগে মালোপাড়ায় দেখে এসেছে দুর্গা মালের মাকে দুর্গার বাবা কয়েকদিন ধরে মদ খেয়ে মারছিলহয়তো তারই খোঁজ নিতে গিয়েছে মাস্টারবলেছিল সন্দীপ এস.আই. ভাবলেন আচ্ছা, তাহলে মাস্টারকে একটা ফোন করে দেখি ছোটনকে ফোন করে এস.আই. জানতে পারেন ছোটন সত্যি ওই মালোপাড়াতে নেই কিন্তু সন্দীপের এই গায়ে পড়ে মাস্টারকে বাঁচানোর বিষয়টি উনার ভালো লাগে বিচক্ষণ এস.আই. অনুমান করেন, ছোটন নিশ্চয় এদের সঙ্গে আন্তরীক ভাবে যুক্ত নইলে নবছর স্কুল ছাড়ার পরও সন্দীপ তার মাস্টারকে বাঁচাতে মিথ্যে বলবে কেন? এটাই তো আন্তরিক সম্পর্ক  এটাই মাস্টারের সঙ্গে গভীর বন্ধন এদের এস.আই. এটা ভেবে আশ্বস্ত হন যে, হয়তো ছোটন আজ অনুপস্থিত, কিন্তু এদের বা স্কুলের সামূহিক ক্ষতি সে করতে পারবে না নইলে এত ভালবাসা সে এদের কাছে পেত না  যারা উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের কাছেও মিথ্যে বলতে পিছপা হয় না একদিনের অনুপস্থিতি বহুবছরের সেবার কাছে  অপরাধ হিসাবে অতিতুচ্ছ সাহেব সেদিন হৃষ্টমনে তার অভিমুখ ঘুরিয়েছিলেন

দেবাংশী বাড়ি থেকে আসা চা খেয়ে ছোটন অভ্যাসমতো স্কুলের পিছনে গিয়ে একটা সিগারেট ধরালো দূরে কয়েকটি ছেলে, হয়তো ছোটনের ছাত্রছাত্রীগুলো খেলা করছিল কে বলবে এদের মধ্যে করোনাবিধি চলছে কে বলবে গ্রামের মানুষগুলো অজ্ঞ হলেও, মনের জোরে সব বিপদকে পাশ কাটাতে পারে কে বলবে এ-গ্রামে এখনও করোনাতে মৃতের সংখ্যা শূন্য কে বোঝাবে রোগকে জয় করতে গেলে এক টুকরো কাপড় নয়, তার জন্য চায় গ্রামের এঁটেল মাটির মতো মনের জোর কে বোঝাবে মাস্টার না থাকলে ওই ছেলেগুলো একটাও বইয়ের পাতা খুলবে না, সকাল থেকে সন্ধ অবধি ফোন-টিভিতে ডুবে থাকবে অ্যাক্টিভিটি টাক্সের কাজের বাইরেও যে বহু পড়া থাকে, সেগুলো তাদের পড়াবে কে? এসব কথা ফেসবুকের পেজে অনেকবার লিখবে ভেবেছে ছোটন ্যাজজট্যাগ দিয়ে ছোট ছোট করে তার বয়ানও তৈরী করেছিল সে, কিন্তু সাহসে কুলিয়ে উঠতে পারেনিবাড়ি বাড়ি গিয়ে কয়েকদিন ছেলে পড়ানো অবশ্য চলেছিল কিন্তু সেটাও আপাতত বন্ধ সরকারের তরফে অনলাইন ক্লাসের কোন ব্যবস্থা প্রাইমারি ছাত্রছাত্রীদের জন্য করা হয়নি মাসকাবারি মিড-ডে-মিলের সামগ্রী বিতরণে আমাদের সব দায়িত্ব কী শেষ হয়ে যায়? পঠনপাঠনের কোন স্থায়ী ব্যবস্থা ছোটন নিজে থেকেও নিতে পারেনা ছেলেগুলোর এই দূরাবস্থার কথা ভেবে ছোটনের নিজেকে বড্ড অসহায় মনে হয়নিজেকে মনে হয় নিছক একজন কর্মচারী মাস্টার হয়ে গ্রাম্য পরিবেশ বুঝে, ছেলেদের মুখ তাকিয়ে কোন ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারও তার নেই! এসব ভাবতে ভাবতে সিগারেটের শেষ ধোঁয়ার সঙ্গে দীর্ঘনিশ্বাটি অজান্তেই বেরিয়ে আসে কি যেন ভেবে একটু তাড়াতাড়ি ক্লাসের ভিতরে ঢোকে ছোটন টেবিলটার সামনে টান টান হয়ে দাঁড়ায় একনাগাড়ে আওড়াতে  থাকে— ‘ঘন মেঘ বলে ঋ... দিন বড় বিশ্রী......... দিন বড় বিশ্রী.........দিন বড় বিশ্রীকাকে বলছে এসব কথা ছোটন? নিজেকে? না নিজের অক্ষমতাকে? নিজের আক্ষেপকে?  না ছেলেগুলোর ভবিষ্যতের কথা এগুলো? দিন হয়তো আরও বিশ্রী হতে চলেছে এই ফাঁকা স্কুল চত্বরে আর হয়তোজনগণমন অধিনায়ক জয় হের সমবেত কণ্ঠ ধ্বনিত হবেনা পিরিয়ড অন্তর অন্তর ঘণ্টা বেজে উঠবে না ছেলেদের লীলাচপল পায়ের ছাপ জীবাশ্ম হয়ে যাবে দরজা জানলার ভিতর দিয়ে শুধু বয়ে যাবে শীতের শুকনো বাতাস বসে বসে সে শুনতে পাবে তালপাতার সাঁইসাঁই ডাক বাথরুমের ভাঙা দরজাটার ক্যাঁচর ক্যাঁচর শব্দ নাহ্ আর ভাল লাগছে না ছোটনের, ফাঁকা ক্লাসরূমের বরফ কঠিন নীরবতা তাকে গ্রাস করছে চেয়ার-টেবিল-চক-ডাস্টার সবই যেন তার সঙ্গে দূরত্ব রচনা করে নিচ্ছে  এ স্কুল যেন আর তার নয়! আর ভিতরে থাকতে পারে না ছোটন মাস্টার বাইরের চেয়ারে এসে বসে গোটা শরীরটা তুলোর মতো হালকা হয়ে যাচ্ছে ওর বুকের ভিতরে একটা জগদ্বল পাথর চেপে বসেছে আর পারছে না সে, নিজেকে প্রকৃতস্থ করতে তাই সে হেঁকে ওঠে— ‘দে.......ল্যাংটা ভোলা তখন ওই দূরের ছেলেগুলোর সঙ্গে খেলায় মত্ত সে আওয়াজ দেবের কানে পৌঁছায় না  যদি বা পৌঁছায়  আত্মভোলা দেব তো নিজের মর্জি ছাড়া আসবেও না কিন্তু ওই দেবকে এখনই চায় ছোটনের, এখনইকিংবা দেবের মতো অন্য কোন ছাত্র বা ছাত্রীকে যাদের সঙ্গে দুটো কথা বলে সে নিজেকে একটু হালকা করে নিতে পারবে ওদের কথার ওষুধে জীবনের জটিল চিন্তাভাবনাগুলো একলহমায় দূর করতে পারবে কিন্তু কেও কোথাও নেই ছোটন আরেকটু জোরে আবার হাঁক মারে— ‘দে................দে.......

 ছেলেগুলো তখনও দূরে খেলা করছে -অঞ্চলের চাষাভুসো মানুষগুলো তিনটের আগে দুপুরের ভাত খায় না তাই বাচ্চাগুলোর স্নান বা খাওয়ার কোন তাড়া নেই বাবামায়েরা সারাদিন মাঠে কাজ করে তাই বকাঝকারও লোক নেই স্কুল নেই, তাই নেই লেখাপড়ার বালায় চেয়ারে বসে বসে ওদের দিকে চেয়ে থাকে ছোটন ওরা যদি ওর কাছে এসে খেলা করত তাহলে খুব ভাল হতো অনন্ত দুটো কথা বলে সে হাঁফ ছেড়ে বাঁচত করোনার বিধিক্যালেন্ডারকে ছিঁড়েখুঁড়ে একাকার করে দিত সে এভাবে তিলে তিলে একা হয়ে মরার থেকে করোনাকেও মেনে নিতে পারে সে অনন্ত কিছুকাল তো বাঁচা যেত! তবু কোন ছেলেই স্কুলের ধারে কাছে আসে না স্কুল অপেক্ষা ফাঁকা মাঠের আকর্ষণ তাদের কাছে আজও অনেক বেশী সবুজমোড়া গাছের ছায়ায় তারা প্রকৃতিকে আরও কাছ থেকে পায় ছোটনের মনে পড়ে কবিগুরুর প্রকৃতির কোলে শিক্ষাব্যবস্থার কথাকে চার দেওয়ালের গণ্ডীর বাইরের joyful learning-এর অমোঘ সত্যকে কিন্তু সেসব ছোটন নতুন করে চালু করতে পারবে না একেই কঠিন করোনাবিধিতে গোটা দেশকে শিকল দিয়ে বাঁধা হয়েছে মুখ থেকে ঘরের দরজাতে পরেছে কুলুপ সেখানে joyful learning-এর কথা? ছোটনের এ-কথা শুনলে শিক্ষাদপ্তর  বলবে— ‘এ মাস্টার পাগল নাকি? দেশে কী চলছে সে খবর কি মাস্টার জানেন না?’এমনকি এই করোনাকালে একদুটো ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে শিক্ষাদপ্তরের কাছে তাকে অপদস্তও হতে হয়েছিল চুরি করে মালোপাড়ার ধর্মরাজ তলায় ছেলেদের নিয়ে ক্লাস করতে গিয়ে সে ধরা পরেছিল আবার মিড-ডে-মিল বিতরণের সময় অভিভাবকদের সঙ্গে চলে আসা ছাত্রছাত্রীদের সে ফিরিয়েও দেয়নি বরং তারা প্রতিমাসেই মা-বাবার সঙ্গে চালডাল নিতে এসেছে তাতে ছোটন খুশিই হয়েছে দীর্ঘদিন তাদের মুখ না দেখতে পেয়ে একটু প্রশান্তি পেয়েছে তাদের মাথার চুল থেকে হাতের নখ, দাঁত থেকে কানের ফুটো, অ্যক্টিভিটি টাক্স দেখেছে পাঠ্য ছড়া-কবিতাগুলো ওদের দিয়ে আউরে নিয়েছে সবশেষে একটু গাল চিপে আদর করতে ছাড়েনি কিন্তু নিয়ম ভাঙা মাস্টারের এই কাজ পাশের স্কুলের শিক্ষানুরাগী শিক্ষকের আনুকূল্যে এস.আই.-এর কানে যায় তাতে ছোটনকে বারদুয়েক শোকজ করা হয় শিক্ষক সমাজে ছোটনের মাথাটি হেঁট হলেও এসবকে সে ধার্তব্যের তালিকায় আনেনি নিয়মের থেকে মনের অকৃত্রিম চাওয়াকে প্রাধান্য দিয়ে ছেলেদের স্কুল-আসাকে মেনে নিয়েছে বরং বলা ভাল প্রশ্রয় দিয়েছে কতদিন ছেলেদের কাছে থেকে দূরে থাকবে সে? দুদুটো বছর কি কম? তাতে জেনারেশন গ্যাপের বিষয়টি কি কেও ভাববে না? স্কুল না থাকলে যে এই ব্যাকওয়ার্ড গ্রামের ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা শিকেয় ওঠে সেটা কে কাকে তথ্য সহযোগে বোঝাবে? যারা টিউশন দিতে পারে না, যাদের মা-বাবা একপ্রকার নিরক্ষর,তাদের কাছে স্কুলই যে একমাত্র সম্বল সব কথা লিখিত দিতে গেলেই মাস্টারকে কালামুখী করোনার দোহাই দিয়ে বলে দেওয়া হবে—এই অবস্থায় স্কুলে ছাত্র? আপনার মাথাটা কি গিয়েছে নাকি?’ ছোটনের মনকে কে দেখবে? কে দেবে ছাত্র-শিক্ষকের আন্তরিক ভালবাসার মূল্য? ছোটন যদি স্কুলে এসে ছেলে ছেলে করে ডুকরে ডুকরে কাঁদে, তাতেও তাকে ছেলেদের কাছে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হবেনা ভলবাসাকে কঠিন হাতে দমন করা হবে প্রয়োজনে নিয়ম অবমাননার খেসারত দিতে হতে পারে তখন একমাত্র স্বৈরাচারী হওয়ার পথ খোলা থাকে সেক্ষেত্রে চাকরি ছেড়ে স্ব-উদ্যোগে তাকে ছেলে পড়াতে হবে কিন্তু সে  সাহস ছোটনের নেই চাকরি-বাকরির যা হাল, তাতে অন্য একটা চাকরি জুটিয়ে নেবে সে ভরসাও ছোটন পায় না অগত্যা বশ্যতা স্বীকার করে, মনের কষ্টে তাকে ওই প্লাস্টিক চেয়ারে বসে থাকতে হয় নিয়মের অদৃশ্য বাঁধনটা সে হাতে-পায়ে, ঘরে-বাইরে, এমন কি অনুভব করে মনের ভিতরে কঠিন নিয়মের বাঁধনে তাকে চলতে হবে মনের কোন স্থান অনন্ত ভার্চুয়াল জীবনে নেই

দুপুর তখন প্রায় দুটো হঠাৎ পিঠে একটা নরম ছোঁয়া অনুভব করে ছোটন ওই ছোঁয়া পেয়ে চোখবুজেই থাকতে ইচ্ছে করে তার এই ছোঁয়া বহু চেনা, বহু আপনত্বের মুখ ফিরিয়ে দেখতে ইচ্ছে করে না ছোটনের মনে হয়, থাক না আরেকটু  মাটির সোঁদা গন্ধ নাকের ভিতর হয়ে হৃদয়ে পৌঁছায় কচি গায়ের রেশম-কোমল স্পর্শ ত্বক হয়ে সারা শরীরের লোমগুলোকে আবিষ্ট করে চোখ ফিরিয়ে দেখে দেবশিশুটি ভুবনমোহিনী হাসি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে তার চেয়ারের পিছনে গলায় ঝুলছে মানতের মাদুলি কোমড়ের লাল ডোরে ঘুমুরঘণ্টা হাতে মা ষষ্টীর ধাগা এসব খুব ভাল করে লক্ষ্য করতে থাকে ছোটন মনে মনে বলতে থাকে— “ তুমিই তো দেবতা, দেবশিশু তুমি তোমার ঘণ্টা নিনাদ বাজিয়ে জগতকে বিপদমুক্ত কর  ধাগায় বেঁধে ফেল সব অসুখের বীজ মুক্ত কর পৃথিবীকে তোমার থেকে ছোটনের দূরত্বকেও দাও মুছে সে যেন আবার তোমাদের মাঝে, তোমাদের মতো হয়ে বাঁচতে পরে হে দেবপ্রতীম মুক্ষিয়াম স্বহা

ন্যাংটো দেবতা তবুও নিরুত্তর থাকে মুখের হাসিতে যেন বুঝিয়ে দেয়— ‘সবই জগতের লীলা সুখ-দুঃখ, চাওয়া-পাওয়া সবই চক্রবত কঠিন নিয়মের দাস আমরা সবাইদেবকে দেখে ছোটনের তখন রাগ হয় বিরক্ত লাগে তাকে মনে মনে ভাবে— ‘এই কি তোমার বিচার? কি এমন নেই যা তুমি পার না? পৃথিবীর গরল সাফ করা কী এতই অসাধ্য?’ মৌনবালক শুধু হাসে তার তাৎপর্য বা প্রাসঙ্গিকতা কিছু বুঝে উঠতে পারে না ছোটন মাস্টার ঘড়িতে ঢং ঢং করে তিনটের ঘণ্টা বেজে ওঠে হয়ত তিনটে ঘণ্টা স্বর্গ পাতাল মর্তের উদ্দেশ্যে ধ্বনিত হল অসুখ আর আনন্দের লড়াইয়ে কে জিতবে তারই সতর্কবার্তা যেন ওটা এই লড়াইয়ের ঘণ্টা সর্বত্রতিন তালে যা অনবরত গোপনে ধ্বনিত হচ্ছে তারই সঙ্গে যেন স্কুলের পুরনো দিনকে ফিরে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষাও বেজে উঠছে জলে-স্থলে-নভশ্চরে আর কিছু চিন্তা করে উঠতে পারে না মাস্টার ধীরে ধীরে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়গায়ে তাপ অনুভব করে কোনরকমে গেটে তালা দিয়ে চাবিটি দেবের হাতে গুঁজে দেয় ছোটন মনে মনে বিড়বির করে বলতে থাকে— ‘সব বন্ধসব বন্ধসব বন্ধএক লাথিতে বাইক স্টাট করে বেরিয়ে পড়ে স্কুল থেকে তখনও দিগম্বর দেব গেটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে, যতক্ষণ তার স্যারকে চোখে দেখা যায় ততক্ষণ একটু দূরে গিয়ে হঠাৎ বাইক থামিয়ে ঘাড় ঘুড়িয়ে পিছু দেখল ছোটন দেখল, তার দেব তখনও গেটের সামনে দাঁড়িয়ে দেবের মুখ থেকে আস্তে আস্তে হাসির রেখাটা মুছে যাচ্ছে, হালকা কুয়াশায় দেবের মুখটা অদৃশ্য হচ্ছে ধীরে ধীরে দেবের গোটা অবয়বটাকে স্কুলের বিরাট বিল্ডিং যেন গ্রাস করে নিচ্ছে স্কুলের দেওয়ালের লেখাটা দূর থেকে কিছুটা দেখা যাচ্ছে, যাতে লেখা আছে—‘ছেলেমেয়ে সবাই এসো... স্কুলের কোলে পড়তে বসোআস্তে আস্তে ছোটনের চোখ ঝাপসা হয়ে উঠছে সব যেন ভিজে ঘন অন্ধকার হয়ে উঠল, চোখের কোনটা মুছে আবার বাইক স্টাট করে সমানে এগিয়ে চলল ছোটন মোটর বাইকের দীর্ঘ ও উচ্চনাদ গোঙানিটা আজ কেন যে হচ্ছে বুঝতে পারে না সে এটা কি তার মনের ভিতরের গোঙানি? যার বহিঃপ্রকাশ মোটর ইঞ্জিনের ভিতরটাকেও চঞ্চল করে তুলছে?

বাড়ি ফেরার পর সন্ধ্যে থেকেই ছোটনের জ্বর নাকে গন্ধ নেই, স্বাদ গাঁটে গাঁটে ব্যাথা জ্বরের রেশটাও কদিন ধরে থামছে না তার জ্বরের ঘোরে ছোটন মাস্টার থেকে থেকে আউড়াচ্ছে— ‘দে.....................দে.............

 লেখকের  অন্যান্য লেখা পড়তে এখানে ক্লিক করুন ।

 লেখক পরিচিতি—

কবি ও কবিতা বিশ্লেষক। প্রাবন্ধিক। লোকসংস্কৃতির ক্ষেত্র-সমীক্ষা ভিত্তিক গ্রন্থ রচয়িতা। নানা লোকসেবামূলক সংস্থার সদস্য।