গ্রামকে পূর্ণাঙ্গভাবে শক্তিশালী করার মাধ্যমে
স্বদেশপ্রেমকে জাগ্রত করতে চেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি বিশ্বাস করতেন
রাজনীতির বক্তৃতা বা আন্দোলনের সঙ্গে পল্লীর সর্বাঙ্গীণ উন্নতির মধ্য দিয়েই
এদেশের স্বাধীনতা অর্জন সম্ভব। ১৯৩৪ সালের ৬ই ফেব্রুয়ারি
শান্তিনিকেতনের বার্ষিক উৎসবে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন-" অন্যের উৎপাদন হয়
পল্লীতে ....গ্রামে উৎপাদন করে বহু লোক ...শহরে ভোগ করে অল্প সংখ্যক মানুষ।"
কলকাতা শহরের জমিদারি বংশে রবীন্দ্রনাথের জন্ম হলেও
বারংবার তাঁর কাজের উৎসাহ জুগিয়েছে গ্রামের বহু অভিজ্ঞতা। শিলাইদহে জমিদারি কাজে
থাকাকালীন তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন অন্নহীন শিক্ষাহীন,স্বাস্থ্যহীন
রুক্ষ,শুষ্ক গ্রামের প্রকৃত চিত্রটিকে। একাধারে দুঃখ
যন্ত্রণা অপরদিকে আনন্দের কৌতূহলে উপভোগ করেছেন পল্লীজীবনকে। পরনির্ভরতা,কুসংস্কার অশিক্ষা,অনুন্নত ভাবনা-চিন্তা এবং
সর্বোপরি নিজেদের অসম্মানিত বোধের জন্যই যে গ্রামগুলি পিছিয়ে রয়েছে তা
রবীন্দ্রনাথ উপলব্ধি করে করতে পেরেছিলেন এবং সেই সঙ্গে সরাসরি গ্রামের মানুষদের
উপকার করাও যে শক্ত কাজ তাও তিনি অনুভব করতে পেরেছিলেন একাধিকবার। তাই তিনি একান্ত
তার নিজস্ব চিন্তার মধ্য দিয়ে শিলাইদহ থেকে শুরু করেছিলেন গ্রাম উন্নয়নের কাজ।
১৯১৫-১৬ সালে শিলাইদহের বিভিন্ন গ্রামে গ্রামে গড়ে
তোলেন হিতৈষী সভা। এই সভার মাধ্যমে গ্রামের শিক্ষা স্বাস্থ্য ও পরিকাঠামোগত
উন্নয়নের জন্য কাজ শুরু করেন রবীন্দ্রনাথ। পাঠশালা,মধ্য ইংরাজি,উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে গ্রামীণ শিক্ষার করুন হাল
ফেরানোর চেষ্টা করেন। বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে গ্রামের চাষবাসের উন্নয়ন ঘটিয়ে
গ্রামবাসীদের অর্থ উপার্জনের ব্যবস্থা করতে পেরেছিলেন তিনি এই হিতৈষী সভার মধ্য দিয়ে।
এছাড়া ম্যালেরিয়ার প্রকোপ কমানোর জন্য ঝোপ জঙ্গল পরিষ্কার,পানীয় জলের
জন্য কূপ খনন ,পুকুর সংস্কার ,গ্রামের
রাস্তাঘাট নির্মাণ করেছিলেন গ্রামবাসীদের একান্ত সহযোগিতায়। তবে রবীন্দ্রনাথ
ঠাকুরের গ্রাম উন্নয়ন ভাবনার উৎকৃষ্ট পরিকল্পনা ছিল গ্রামে গ্রামে শস্য গোলা
নির্মাণ। যার ফলে খরা বন্যা বা দুর্ভিক্ষের সময় বহু মানুষ বহু রকম ভাবে উপকৃত
হতেন এর থেকে।
শিলাইদহের বিভিন্ন গ্রামে কাজ করতে গিয়ে তাঁর অভিজ্ঞতা
হয়েছিল যে কৃষির প্রকৃত উন্নয়নের উপরেই গ্রামের প্রকৃত বিকাশ সম্ভব। তাই তাঁর
জ্যেষ্ঠ পুত্র রথীন্দ্রনাথ এবং কনিষ্ঠ জামাতা নগেন্দ্রনাথ কে কৃষি ও গোপালন বিদ্যা
শিক্ষার জন্য সঞ্চিত বহু অর্থ খরচ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাঠান। এছাড়া
তৎকালীন গ্রামীণ কুটির শিল্প যেমন হাতের তৈরি তাঁত জাতীয় বস্ত্র, মাটির তৈরি নিত্য ব্যবহার থাকা গ্লাস,লোহার তৈরি কাস্তে হাতুড়ি
কোদাল প্রভৃতি জিনিসপত্র নিয়ে গ্রামীণ বাজার স্থাপনের মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতিকে
শক্ত করার চেষ্টা করেন তিনি। এর ফলে একদিকে যেমন ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সচল হতে শুরু
করে অপরদিকে গ্রামের মানুষেরা স্বনির্ভর হয়।
অর্থাৎ গ্রামের সর্বাঙ্গীণ উন্নতির মাধ্যমে ভারতবাসীর
আত্মমর্যাদা স্বনির্ভরতা এবং ক্ষমতায়নের মধ্যেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সুস্থ সবল
পল্লীসমাজ গঠনের পথ তৈরি করেছিলেন।
লেখক পরিচিতি---
অরিজিৎ হাজরা। জন্ম বীরভূমের নগরী
গ্রামে। শিক্ষকতার পাশাপাশি একাধারে প্রাবন্ধিক গল্পকার প্রতিবেদক ও গবেষক।
.jpg)