রাঢ় অঞ্চলের জেলা বীরভূম প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ হওয়া
সত্বেও সুদূর ব্রিটিশ আমল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত ভারী শিল্পের তেমনভাবে প্রসার
ঘটেনি । কিন্তু ক্ষুদ্র মাঝারি বা কুটির শিল্পের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
পালন করে চলেছে এই জেলা । তবে সময়ের সাথে সাথে বহু শিল্পই হারাতে বসেছে তার
ঐতিহ্যকে।
১৭৮২ খ্রিস্টাব্দে ফরাসি পুঁজিপতিদের হাত ধরে বীরভূমের
গুণুটিয়ায় শুরু হয় রেশম শিল্প। পরবর্তীকালে ব্রিটিশ শাসনকালে চিফ ডেভিড১৭৯৫
সালে নীল চাষ শুরু করেন যার অন্যতম কেন্দ্র ছিল এই গুনুটিয়া। চিফ ডেভিডের পরবর্তী
বংশধর বীরভূমের কয়েকটি স্থানে কয়লা খনি নির্মাণ করেন এবং তৈরি করেন বীরভূম কোল
কোম্পানি। ইংরেজ শাসনকালে বীরভূমের নারানপুর, গনপুর ,ডেউচা
দামড়া,বেলে নারায়ণপুর প্রভৃতি অঞ্চলের প্রায় ৭০টি অধিক
চুল্লি দিয়ে প্রায় ২৩৮০ মন-এর অধিক লোহা উৎপাদনের কাজ হতো।
তবে এখন সেগুলি সবই ধ্বংসাবশেষে পরিণত হয়েছে।
বীরভূমের বোলপুর এর কাছে সুরুলে প্রথম চিনি শিল্প শুরু
করেছিলেন তৎকালীন বড় বাঙালি ব্যবসায়ী আশানন্দ সরকার। স্বাধীনতার পর
১৯৫১খ্রিস্টাব্দে আমোদপুরে সুগার মিলের প্রতিষ্ঠা হয়।
প্লাস্টিকের জিনিসপত্রের জনপ্রিয়তার আগে গ্রাম ও শহরের
মানুষজনদের ব্যবহারে গুরুত্বপূর্ণ দ্রব্য ছিল মোড়া ।বাঁশের তৈরি মোড়া শিল্প
বীরভূমের গুরুত্বপূর্ণ কুটির শিল্পের অন্যতম । বাঁধ গরাকে এখনো মোড়া গ্রাম বলা
হয়। এছাড়া খয়ের বুনি ঢেকা, প্রভৃতি গ্রামগুলি একসময় মোড়া তৈরি
জন্য বিখ্যাত ছিল।
বীরভূমের পশ্চিমের শেষ প্রান্ত রাজনগর ব্লকের আলিনগরে
১৯৬০ সালে তৎকালীন পশ্চিমবাংলার মুখ্যমন্ত্রী ডাঃ বিধান চন্দ্র
রায়ের উদ্যোগে গড়ে ওঠে কোঙ্গার দড়ি শিল্প। প্রথমদিকে এখানকার দড়ি বেশ জনপ্রিয়
হলেও পরবর্তীকালে আধুনিক উৎপাদিত দ্রব্যের সাথে প্রতিযোগিতার বাজারে পাল্লা দিতে
না পারার জন্য বর্তমানে প্রায় ভগ্ন অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে শিশালফার্মের এই দড়ি শিল্প।
তবে আধুনিক পোশাকের বাজারে বেশ লড়াই করে এখনো দাঁড়িয়ে
আছে বীরভূমের তাঁত শিল্প। ব্যাপক চাহিদায় ভাটা পড়লেও তাঁতিদের তৈরি তসর জাতীয়
নানা ধরনের বস্ত্রের জনপ্রিয়তার কোন খামতি নেই ক্রেতাদের মধ্যে। করিধ্যা,তাঁতীপাড়া
সাঁইথিয়ার মুরাডিহি কলোনির তাঁত শিল্পজাত দ্রব্যের চাহিদা রয়েছে সারা পৃথিবী
জুড়ে ।আধুনিক যন্ত্রের সাহায্যে চাহিদা ও
যোগানের ভারসাম্য বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে এখানকার তাঁতিরা।
মাটির ঘোড়া,পুতুল,মুড়ি ভাজার খাপুরি,গরুর খাবারের দোনা,হাড়ি,মালশা,জল রাখার কলসি প্রভৃতি মাটির তৈরি বিভিন্ন জিনিসপত্র তৈরি হয় বীরভূমের
বিভিন্ন প্রান্তে। পাই শিল্প বীরভূমের অন্যতম একটি ঐতিহ্য সম্পন্ন কুটির শিল্প । অতীত
থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে এখনো ধান চাল সর্ষে মুড়ি কলাই
প্রভৃতি পরিমাপের জন্য পাই এর ব্যবহার
রয়েছে। পাই তিন ধরনের। বড় আকারে পাত্রটিকে সের, মাঝারি
আকারটিকে পাই এবং ছোট আকারের দিকে প বলা হয়। খয়রাশোল থানার লোকপুর গ্রাম এই পাই
শিল্পের জন্য বিখ্যাত। সিউড়ির মোরব্বা জগত বিখ্যাত। এখানে বেল, আমলকী, পেঁপে, হরিতকী, আনারস, আম প্রভৃতির
মোরব্বা তৈরি করা হয়।
এছাড়া তাঁতী পাড়ার জিলিপি, করিধ্যার
রসগোল্লা, আমদপুরের গজা, কিন্নাহারের
মন্ডা, বোলপুরের রসকদম প্রভৃতি মিষ্টির ঐতিহ্য আজও সমান ভাবে
প্রাসঙ্গিক। বীরভূমের মোহাম্মদবাজারের প্যাটেল নগরে চিনামাটি শিল্প রয়েছে।
এছাড়া পাঁচড়ার কাঁসা-পিতল শিল্প ইটাগোরিয়ার পট শিল্প,শান্তিনিকেতনের
কাঁথাস্টিচ শিল্প প্রভৃতি বহু কুটির শিল্প অবস্থান করছে বীরভূমের বিভিন্ন প্রান্ত
জুড়ে।
এছাড়া বীরভূমের পাঁচটি সতীপিঠ বর্তমানে এক উল্লেখযোগ্য
পর্যটন শিল্পে পরিণত হয়েছে । পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্তের এমনকি ভারতবর্ষের
বহু পর্যটক বীরভূমে আসেন সারা বছর ধরে। তারাপীঠের মা তারা মন্দির, নলহাটিতে
নলাটেশ্বরী মন্দির ,সাঁইথিয়ায় নন্দকেশরী মন্দির, লাভপুরে মা ফুল্লরা মন্দির, এছাড়া বক্রেশরে বক্রমণি
মন্দির এবং বোলপুরের শান্তিনিকেতনে রবি ঠাকুরের কর্মভূমি শান্তিনিকেতন
পশ্চিমবঙ্গের তথা ভারতবর্ষের পর্যটন শিল্পে উল্লেখযোগ্য স্থান করে নিয়েছে।
লেখকের অন্যান্য লেখা পড়তে এখানে ক্লিক করুন ।
লেখক পরিচিতি -
অরিজিৎ হাজরা,পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার সদর শহর সিউড়িতে বসবাস করেন । দীর্ঘ ২১ বছর ধরে শিক্ষকতার কাজে নিয়োজিত। নেশা হচ্ছে লেখালেখি এবং তথ্যের অনুসন্ধান করা। একজন প্রাবন্ধিক গল্পকার হিসেবেই বেশি পরিচিত ।
.jpg)