ধারাবাহিক উপন্যাস – প্রতি রবিবার
পর্ব - ১
এক
সন্ধের একটু পরে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে বড় ঘরে
ঢুকতেই মেজাজ খারাপ হয়ে গেল সুধাময়ীর। পশ্চিমেরর জানলার কাছে একটা চেয়ারের উপর
দাঁড়িয়ে বাবলু উৎসাহের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে রাস্তার ওপাশে দিশি মদের দোকানে
মাতালদের বিকৃত অঙ্গভঙ্গি। সুধাময়ী সশব্দে জানলাটা বন্ধ করে দিলেন। বাবলু চমকে উঠে
ফিরে তাকাল। ক্ষীণ প্রতিবাদ করে বলল,“তুমি যে
কী কর মা,একটু দেখলে কি হয়?”
“মারবো থাপ্পর,হতভাগা
ছেলে। একটু দেখলে কী হয়? যা পড়গে যা।” সুধাময়ী জোর
করে চেয়ারটা
টেবিলমুখো করে দিয়ে ত্রস্ত পায়ে চলে গেলেন রান্নাঘরে। একটু পরে পাশের ঘরে
অবিনাশবাবুকে চা দিতে গিয়ে সুধাময়ী দেখলেন তিনি খবরের কাগজ সামনে রেখে ঝিমুচ্ছেন।
“কী হল,এই ভর
সন্ধেয় ঝিমুচ্ছ কেন?”
ধড়মড়িয়ে উঠে চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে অবিনাশবাবু
ক্লান্ত গলায় বললেন,“ঘুমটা আমার আজকাল খুব পাতলা
হয়ে গেছে সুধা। শেষ রাত্রে যেটুকু হয়। দিনের বেলা ঘুমোনোতো অনেকদিন ছেড়ে দিয়েছি। অথচ . .”
সুধাময়ী কিছুটা উষ্মার সঙ্গে বললেন,“কানের
কাছে মাঝরাত্তির পর্যন্ত ভূতের কেত্তন হ’লে ঘুমটা কোত্থেকে হবে শুনি?”
অবিনাশবাবু জানেন সুধাময়ী সুযোগ পেলে এই
প্রসঙ্গে আরও দু’চারটে কথা শোনাতে ছাড়বেননা। তাই বললেন,“কণা কি
কচ্ছে?
“রান্নাঘরে তরকারি কুটছে।”
সংক্ষিপ্ত উত্তর দিলেন সুধাময়ী তারপর অবিনাশবাবুকে অন্য কোন প্রসঙ্গ অবতারণার
সুযোগ না দিয়ে বললেন,“ওইতো একটু আগে বাবলু হাঁ করে
জানলা দিয়ে দেখছিলো। কী বুদ্ধিতে যে এ জায়গায় জমি কিনতে গেলে ভাবি।” দীর্ঘনিঃশ্বাস
ফেললেন সুধাময়ী। অবিনাশবাবু শুধু বললেন,“কপাল,সুধা,সবই আমার
কপাল। কলাকাতার বাইরে শান্ত পরিবেশে অবসর জীবন কাটাবো ভাবলাম আর সস্তায় দু’কাঠা
জমিও পেয়ে গেলাম। হারু ঘোষের দোকানটা তো তখন ছিলনা। নাঃ কিছু তো একটা করতে হবে।
দেখি কী করা
যায়।” তারপর
চটপট কাগজটা তুলে নিয়ে গভীর মনোযোগ দিয়ে বাজার দর পড়তে লাগলেন।
“তুমি শুধু দেখতেই থাকবে।”
সুধাময়ী বুঝতে পারলেন অবিনাশবাবু বেশ কিছুক্ষণের জন্য রাজ্যে যে দুই প্রধান
রাজনৈতিক দলের মধ্যে চপান উতোর চলছে তার মধ্যে তলিয়ে গেলেন, তাই তিনি
ফিরে গেলেন রান্নাঘরে।
কিন্তু রাতে খেতে বসে অবিনাশবাবুকে মুখ খুলতে
হল। পশ্চিমের জানালাটা বন্ধ থাকলেও বেশ সোরগোলের শব্দ ভেসে
আসছিল। হারু ঘোষের মদের দোকানে সন্ধে সাতটার পর প্রায়ই একটা ছোটখাট মারামারি লেগে
যায়। মারামারির চাইতে চেঁচামেচিটাই বেশি হয়। মারামারি থেমে যাবার অনেকক্ষণ পরেও
দমকা হাওয়ার মত হঠাৎ হঠাৎ প্রচন্ড সোরগোলের শব্দ পাওয়া যায়। সুধাময়ী কান খাড়া করে
শুনছিলেন,বললেন,“একদিন
একটা খুনখারাবি হয়ে যাবে তবে গিয়ে এই বেলাল্লাপানা থামবে।”
“থামতো মা,” কণা
ঝাঁঝিয়ে উঠল। “ তুমি অমন কান খাড়া করে থাকো কেন সব সময়? ওরা যা
খুশি তাই করুক,আমাদের কি?”
একটু আগে বিজলি চলে যাওয়ায় সুধাময়ী হাতপাখা
নেড়ে বাবলুর ভাত ঠান্ডা করছিলেন। ঠক্ করে মাটিতে পাখাটা ঠুকে বললেন,“তোমাদের
আর কী, জানলা খুলে ওদের বেলাল্লাপানা দেখ আর ওই শেখ।”
বাবলু হঠাৎ ভাতের থালা থেকে মুখ তুলে
অবিনাশবাবুকে জিজ্ঞেস করল,“ বাবা তাড়ি খেলে মানুষ ওরকম
হয়ে যায় কেন?”
অবিনাশবাবু বললেন,“তাড়ি খেলে
মানুষ আর মানুষ থাকেনা,ওরা পশু হয়ে যায়।”
“তাই বুঝি ওরা ওমনি মাটির উপর
গড়াগড়ি খায়,হ্যাঁ বাবা?”
অবিনাশবাবুকে আর কষ্ট করে উত্তর দিতে হলনা,দমকা
হাওয়ার মত সেই সোরগোলের আওয়াজ ফেটে পড়ল আরেকবার। অবিনাশবাবু বললেন,“ তাড়াতাড়ি
খেয়ে ওঠ বাবলু।“
তাড়াতাড়ি খাওয়া সেরে অবিনাশবাবু বড় ঘরের
পশ্চিমের জানলার সামনে দাঁড়ালেন তারপর জানলাটা একটু ফাঁক করে বাইরে তাকালেন।
রাস্তার ল্যাম্প পোস্টের আলোতে তিনি পরিষ্কার দেখলেন হারু ঘোষের দোকানের সামনে
মাটির উপর দুটো লোক জড়াজড়ি করছে আর বেশ কিছু মাতাল দুটো বেঞ্চির উপর বসে মাঝে মাঝে
স্খলিত গলায় উৎসাহ দিচ্ছে যুদ্ধমান দুই মাতালকে। দৃশ্যটা দেখতে দেখতে অবিনাশবাবুর
রাতজাগা চোখ জ্বালা করতে লাগল, কপালের
শিরা সহসা যেন টনটন করে উঠল। তার মনে হল হারু ঘোষ যেন তার ঘুম নষ্ট করার জন্যই,তাকে
সুধাময়ীর কাছে অপদস্থ করার জন্যই প্রত্যেকদিন সন্ধ্যায় এই মাতালের হাট বসিয়ে
যাচ্ছে। জানলাটা বন্ধ করে নিঃশব্দে পাশের ঘরে গিয়ে অবিনাশবাবু শার্টটা গায়ে দিয়ে
বেরিয়ে আসলেন। রান্নাঘর থেকে পায়ের শব্দ শুনে সুধাময়ী বেরিয়ে এসে সামনে দাঁড়ালেন।
“এত রাতে কোথায় যাচ্ছ?”
“ভাবছি খাওয়ার পর এখন থেকে
রাস্তায় একটু পায়চারি করলে কেমন হয়?”
“ভালই হয়,কিন্তু
এতরাতে রাস্তায় পায়চারি করে আর কাজ নেই। রাস্তায় যেতে হবেনা, ঘরের
সামনেই তুমি পায়চারি কর।”
অবিনাশবাবু মিস্টি হাসি হেসে বললেন,“তুমি সব
সময় আমায় এমন আগলে রাখতে চাও কেন বলতো?” তারপর
সুধাময়ীর প্রসারিত হাতটা সরিয়ে দিয়ে বললেন,“যাই দেখি
বেঁটে বোসের সঙ্গে একহাত দাবা খেলে আসি।”
অবিনাশবাবু বাড়ির সামনের দরজা দিয়ে বেরোলেও
সুবীর বোসের বাড়ির দিকে না গিয়ে নিজের সীমানা ঘুরে পিছনের রাস্তায় এসে দাঁড়ালেন।
নিজের ঘরের দিকে তাকিয়ে দেখলেন জানলাটা বন্ধই আছে। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে
অবিনাশবাবু এবার বড় রাস্তার উপর দাঁড়িয়ে হারু ঘোষের মদের দোকানের দিকে নজর
ফেরালেন। মারামারি হৈ হুল্লোরটা এতক্ষণে থেমে গেছে। গুটি কয়েক পাড় মাতাল শুধু
বেঞ্চের উপর বসে বিকৃত, জড়িয়ে আসা গলায়, কথবার্তা
বলছে। অবিনাশবাবু তাদের কথাবার্তার এক বর্ণও বুঝতে পারছিলেননা। তার মনে হচ্ছিল
তিনি যেন নূতন অশ্রুতপূর্ব কোন ভাষা শুনছেন যা একমাত্র ওই মাতালরাই জানে। মনে মনে
তিনি ঠিক করে নিলেন ওদের সামনে কী বলবেন। তারপর ধীর পায়ে এসে দাঁড়ালেন হারু ঘোষের
দোকানের সামনে। হারু ঘোষ মিটমিটিয়ে তাকাল অবিনাশবাবুর দিকে, তারপর
একটু ব্যবসায়ীসুলভ হেসে বলল, “ এক নম্বর?”
অবিনাশবাবু হারুর চোখে চোখ রেখে গম্ভীর গলায়
বললেন, “ আমি তোমার বাংলা মদ কিনতে আসিনি হারু।”
হারু ভ্রু কুঁচকে তাকাল। মনে হল সে যেন কথাটা
বিশ্বাস করতে পারছেনা, কিন্তু তাতে তার বিনয়ের কোন
ঘাটতি দেখা গেলনা। নিজেকে সামলে নিয়ে একগাল হেসে আস্তে করে বলল, “ এজ্ঞে বিলিতিও
আছে, একটু দাম বেশি পড়বে।”
অবিনাশবাবু লোকটার বদান্যতায় একটু আশ্চর্য না
হয়ে পারলেননা। এ তল্লাটের সব লোক জানে হারু ঘোষ ভাড়াটে গুন্ডা হাতে রাখে। মদের
দোকান ছাড়াও সুদে টাকা খাটানোর ব্যবসা করে হারুর লাভ মন্দ হয়না। অবিনাশবাবু একটু
কেশে গলা পরিষ্কার করে বললেন,
“ হারু তোমার দোকানে বড্ড বেশি
চেঁচামেচি হয়।”
“ ওঃ তা একটু হয় বটে, তা আপনার
ইয়ে মানে . . .”
অবিনাশবাবু আঙুল তুলে দেখিয়ে বললেন, “ ওই বাড়িটা
যে আমার তুমি খোঁজ রাখ? তোমার দোকানের চেঁচামেচিতে
আমার ছেলেমেয়ের পড়াশুনা বন্ধ হতে চলেছে।”
“ তাই নাকি, তাই নাকি? আহাহা
তাইতো . . .” হারু ঘোষ সমবেদনায় টইটম্বুর হয়ে উঠল, তারপর যে
চার পাঁচটা বদ্ধ মাতাল তখনও ঢুলছিল তাদের গালাগালি দিয়ে উঠল, “এই শালারা
শুনছিস তোদের জন্য এই ভদ্দরলোকের ছেলেমেয়েরা কেলাসের পড়া করতে পারছেনা। ছি -ছি –
ছি তোদের জন্য আমার দোকানের শেষ পর্যন্ত বদনাম হল। কাল যদি একটা আওয়াজ হয় সবকটাকে
জুতোপেটা করব আমি। কাল কারখানায় গিয়ে তোদের সব স্যাঙাৎদের বলে দিস হারুর
দোকানে কোন গোলমাল করা চলবেনা।”
যাদের উদ্দেশ্য করে হারু গালাগালি দিল,তারা
নির্বিকার মনে বসে বসে ঢুলছিল। ওদের মুখ থেকে তাড়ির গন্ধ অবিনাশবাবুর নাকে এসে
লাগছিল। উনি পকেট থেকে রুমাল বের করে নাকে চেপে ধরলেন। হারু আবার গর্জে উঠল,“এই শালারা
ঢুলছিস কেন এখানে বসে বসে বে? যা ভাগ
বাড়ি যা, আমি এবার ঝাঁপ ফেলব দোকানে।”
“থাক থাক ওদের আর তোমার
এক্ষুণি না তাড়ালেও চলবে,” অবিনাশবাবু একটু লজ্জিত হয়ে
বললেন। তারপর বাড়ির দিকে পা বাড়াবার আগে আরেকবার মনে করিয়ে দিলেন, “ একটু
খেয়াল রেখ হারু, গোলমালটা যেন না হয়, কেমন?”
“দেখলেনই তো স্যার, কেমন ধমকে
দিলাম। চিন্তা করবেননা, সব ঠান্ডা করে দেব দু’দিনে।
আসবে, মদ গিলবে আর চলে যাবে – ব্যস আর কিছু এখানে চলবেনা,” হারু
আশ্বস্ত করল অবিনাশবাবুকে।
অনেকটা ভারমুক্ত হয়ে অবিনাশবাবু ঘরে চলে এলেন
সে রাতে।
ক্রমশ …………
২য়
পর্ব পড়ুন আগামী রবিবার
লেখকের অন্য লেখা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।
লেখক পরিচিতি –
জন্ম এবং শিক্ষা কলকাতায়; কর্মজীবন দিল্লিতে,
কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রালয়ে। গল্প লেখার শুরু ষাটের দশকের
শেষ দিকে। বাংলা এবং ইংরেজি দুই ভাষায় সাহিত্যচর্চা করে আসছেন গত পঞ্চাশ বছর ধরে।
ইংরেজিতে চারটি উপন্যাস ও একটি গল্প সংকলন এবং বাঙলায় চারটি উপন্যাস ও দু’টি
গল্পগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। বিবিসি থেকেও ওঁর কয়েকটি ইংরেজি গল্প প্রচারিত হয়েছে।
দেশ, আনন্দবাজার, সাপ্তাহিক বর্তমান,
নবকল্লোল, পরিচয়, কালি ও
কলম(বাংলাদেশ) এবং দিল্লি ও কলকাতার অনেক সাহিত্য পত্রিকায় গল্প লেখেন নলিনাক্ষ
বাবু। দিল্লি থেকে প্রকাশিত ‘ কলমের সাত রঙ’ পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত আছেন।
.jpg)
